মাছে ভাতে বাঙালি
লিখছেন– সুকন্যা দত্ত
প্রথম পর্ব…
রবিবার সকাল হলেই গিন্নী ব্যাগ ধরিয়ে দেন কর্তার হাতে। জব্বর বাজার করতেই হবে। সেদিনের মেনুতে কচি পাঁঠার ঝোল বা মুরগী হলে ও সপ্তাহের বাকী দিনগুলো তো পাতে পড়বে মাছ। এটাই বছরের পর বছরের কাহিনী প্রায় সব বাড়ীতেই থুড়ি প্রায় সব বাঙালি বাড়ীতে। মৎস প্রিয় বাঙালি বাড়ীতে বাজারটাও হয় পকেট বুঝে। মাসের প্রথমে ইলিশ, ভেটকি,চিতল,কই,পাবদা কিংবা গলদা বাজার থেকে কড়াই হয়ে সোজা পাতে পড়লে ও মাসের শেষটায় পকেটে টান পড়ায় রুই কাতলা দিয়ে চালাতে হয় তবু ও মাছ কিন্তু চাইই। উৎসব অনুষ্ঠানে চড়চড়িয়ে মাছের দাম বাড়লে ও আতিথেয়তায় মাছ বাদ দেওয়া চলে না। পার্শের ঝোল, চিতলের মুইঠ্যা, ভেটকির পাতুরি, ইলিশ ভাপা, তেল কই, সরষে পাবদা এসব নাম শুনলে বাঙালির জিভে জল আসবেই। এমনকি ঘটি বাঙালের দ্বন্দ্ব থাকলে ও মৎস প্রীতিতে মিলটা রয়েই যায়।
আচ্ছা, ওই প্রবাদগুলো তো নিশ্চয়ই শুনেছেন?
কইমাছের প্রাণ, গভীর জলের মাছ, ভাজা মাছ উলটিয়ে খেতে ও জানে না, ধরি মাছ না ছুই পানি এমন সব প্রবাদে ও ঘুরে ফিরে আসে মাছের কথা। এই যে এতক্ষণ মাছ,মাছ করছি তাহলে আসুন শুনে নেই সাহিত্যে মাছের পাকাপোক্ত জায়গাটা কেমন ছিলো, তার কথা।
কয়েক বছর আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় গিয়েছিলাম পট উৎসব উপলক্ষে। পটচিত্রে ফুটে ওঠা মাছের বিয়ের একটা গান শোনালেন এক পটুয়া। গানটা এরকম ছিলো,
“দাঁড়িয়া মাছের বিয়ে করাতে চলো গো রঙিলা
পাবদা, ভেটকি বলছে দেখো,
তোমার হাতের চুড়ি হবো গো রঙিলা।”
লোকগানে এই মাছের প্রসঙ্গ মন কে নাড়া দেয়। তবে বাঙালির এই মৎস প্রীতি শুরু সেই প্রাকৃত পৈঙ্গলের সময় থেকে। সেখানে পাওয়া যায়,
“অগ্গরঅ ভত্ত রম্ভঅ পত্তা,
গাইকো ঘিত্তা দুগ্ধ সযুত্তা
মোইনি মচ্ছা নালিতা গচ্ছা,
দিজজই কান্তা খায় পুনরন্তা”….
কলাপাতায় গরম ভাত,গাওয়া ঘি,মৌরলা মাছের ঝোল এবং নলিতা( পাটশাক) যে স্ত্রী নিত্য পরিবেশন করতে পারেন তাঁর স্বামী পুন্যবান।
বৃহদ্ধর্মপুরাণে ও ব্রাহ্মণদের রুই মাছ ও পুঁটি মাছ খাওয়ার কথা বলা আছে। শিবায়ণ কাব্যে অলস শিবকে চাষাবাদে নিয়োজিত করতে না পেরে গৌরি বাগদিনীর ছদ্মবেশে শিবের ক্ষেতে মাছ ধরতে এসেছিলেন। তাই দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৎসজীবী সম্প্রদায় আজ ও পুকুরের জল সেঁচে মাছ চাষ শুরু করার আগে মাকাল( মহাকাল) ঠাকুরের পুজো করে।ঝুমুর গানে ও উঠে এসেছে এক গ্রাম্যবধূর মাছ ধরার কথা,
” ডুব্যে ডুব্যে মাছ ধরি শুধাই পুঁটি টেংরা
অ ছট দেঅরা,
মালি ফুলে বইসল্য ভমরা।”
আবার টুসু গানে বলা হয়েছে, এক পরিবারের দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর আজ সে অন্নপথ্য গ্রহণ করবে,তাই শস্যোৎসবের দিন,শিশুটির জননী গান গাইছে,
” ছাড় ছাড় ডাক্তার বাবু,আমার রামে আজ ভাত খাবে।
কি কি করব তরকারী?
মুগ মুসুরি পটলভাজা মাগুর মাছের ঝোল করি।”
ভাদ্র সংক্রান্তিতে লাল মাটির দেশে ভাদু উৎসবের দিন মহিলারা সারিবদ্ধ হয়ে গান গায়,
“কাশীপুরের রাজার বিটি
বাগদী ঘরে কি কর?
কলসী কাঁখে লয়ে পরে
সুখ সাগরে মাছ ধর।”
উত্তরবঙ্গের রাজবংশীরা খাল বিল, নদীর মাছের উপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা তাদের কাছে একটা উৎসব। সমবেতভাবে তাদের মাছ ধরাকে বলা হয় “বাহো মারা”। এই বাহো মারা কে ঘিরে নানান গান ও আছে। তার মধ্যে একটি হলো,
” মাছ মারে মাছুয়া ভাই রে ছেকিয়া ফেলায় পানি
হামার মাছুয়া মাছ মারিছে চন্দনা পরুয়া
মাছ মারে মাছুয়া ভাইরে ইলশা শামলং কইরা।”
বাংলা ছড়াতে ও বাঙালির মৎসপ্রীতি লক্ষ্য করা যায়,
“খোকা গেল মাছ ধরতে ক্ষীর নদীর কূলে,
ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে,মাছ নিয়ে গেল চিলে”।
শৈশবে দুলে দুলে এই ছড়া আমরা প্রায় সকলেই তো পড়েছি,তাই না? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও এই জলের প্রাণীটিকে উপেক্ষা করতে পারেননি। সহজপাঠের পাতায় তিনি মাছ কে ঠাঁই দিয়ে লিখেছিলেন,
” বনে থাকে বাঘ,
গাছে থাকে পাখি,
জলে থাকে মাছ,
ডালে আছে ফল”…..
কিংবা সহজ পাঠের দ্বিতীয়ভাগে লিখেছিলেন,
“কাংলা,তোর ঝুড়িতে কী?
ঝুড়িতে আছে পালং শাক,পিড়িং শাক,ট্যাংরা মাছ,চিংড়ি মাছ। সংসার বাবুর মা চেয়েছেন”।
বাঙালির মাছ দিয়ে পেট পুরে ভাত খেয়ে ছুটির দিনে একটা দিবা নিদ্রা চাই। ” চিতল মাছের মুইঠ্যা/ গরমভাতে দুইটা”এই কথাগুলো যেন বাঙালি জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। বাংলাকে বুকের ভিতর আগলে রাখতে তাই মৎস প্রিয় বাঙালি উদাত্ত কন্ঠে গেয়ে ওঠেন,
” বাংলা আমার সরষে ইলিশ চিংড়ি কচি লাউ,
বাংলা পার্শে মাছকে ধুয়ে জিরের বাটায় দাও”।
মাছে ভাতে বাঙালি।
দ্বিতীয় পর্বঃ
মাছের প্রসঙ্গে আসলেই অবধারিতভাবে চলে আসে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এর নাম। বাঙালি এই ধ্রুপদ বাদক কে তার অবাঙালি বন্ধুরা উপহাস করে বলতেন,
“ মচ্ছিকে পানি পিনেওয়ালা”। সেই কথার কোনো উত্তর না দিয়ে অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়ে তিনি বাম হাতে সরোদ বাজানো অভ্যাস করলেন। জয় করলেন ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত জগৎ।
মনসা মঙ্গলের দুই কবি বিজয়গুপ্ত ও দ্বিজ বংশীদাস যথাক্রমে বরিশাল ও ময়মনসিংহের মানুষ ছিলেন। বেহুলার বিবাহের রন্ধন তালিকা বর্ণনায় পনেরো শতকের কবি বিজয়গুপ্ত তার কাব্য লিখেছিলেন,
“ মাগুর মৎস দিয়া রান্ধে গিমা গাচ গাচ,
ঝাঁজ কটু তৈলে রান্ধে খরসুন মাছ।
ভিতরে মরিচ গুঁড়া বাহিরে জড়ায় সুতা
তেলে পাক করি রান্ধে চিংড়ির মাথা।।“
আবার ষোলো শতকের কবি দ্বিজ বংশীদাস
লিখেছিলেন,
“ পাবদা মৎস দিয়া রান্ধে নালিতার ঝোল,
পুরান কুমড়া দিয়া রোহিতের কোল।“
তাদের লেখায় উঠে এসেছে রুই, বোয়াল, খলসে, ট্যাংরা, রিঠা, চিংড়ি, ইলিশ,মাগুর, শিং, মৌরলা, শোল প্রভৃতি মাছের নাম।
নদীমাতৃক বাংলা ও ভূমির ফসলে বাঙালি ভাতে মাছে দিন কাটিয়ে দিতে পারে। ধান ও মাছের এই সহজলভ্যতার কারণেই জীবনযাপনে কিংবা
মনস্তত্ত্বে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে গেছে এই দুটি জিনিস। তাই হয়তো বাঙালি সমাজে ধান হলো ধনসম্পদ ও মাছ হলো উর্বরতার প্রতীক।
চন্ডীমঙ্গলের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাব্যে পাওয়া যায়,
দেবীর আদেশে লহনা নির্বাসিতা খুল্লনাকে বাড়িতে ফিরিয়ে স্নান করিয়ে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন রেঁধে খাওয়ান। সে প্রসঙ্গে তিনি লেখেন,
“ কটু তৈলে রান্ধে বামা চিতলের কোল
রুহিতে কুমড়া বড়ি আলু দিয়া ঝোল।
কটু তৈলে কই মৎস্য ভাজে গন্ডা দশ।
মুঠো নিথারিয়া তথি দিল আদারস”।
এমনকি খাদ্য তালিকায় ‘ শকুল মৎস্যপোনা’ বা শোল মাছ ও বাদ যায়নি।
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের “অন্নদামঙ্গল” এ ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী ব্রাহ্মণভোজনের জন্য আম দিয়ে শোল মাছ, বাচা মাছের ঝোল, ভেটকি, খয়রা মাছ ভাজা রান্না করেন। তিনি আর ও লেখেন,
” নিরামিষ তেইশ রান্ধিয়া অনায়সে।
আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস মাসে।”
অর্থাৎ সমস্ত নিরামিষ রান্নার পর শুরু হয় মৎস রান্না।
ডাকের বচনে ও মাছের কথা আমরা দেখতে পাই,
“পলতা শাক রুহি মাছ।
বলে ডাক বেঞ্জন সাছ।।
মদগুর মৎস্য দাএ কুটিয়া।
হিঙ্গ আদা লবণ দিয়া।।
তেল হলদি তাহাতে দিব।
বলে ডাক ব্যঞ্জন খাব।।
পোনা মাছ জামিরের রসে।
কাসন্দি দিআ যেজন পরশে।“
খনার বচনে ও মাছ জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,
“ মাছের জলে লাউ বাড়ে
ধেনো জমিতে ঝাল বাড়ে”।
কয়েকদিন আগেই জানতে পারলাম মাছের মেলার কথা। মাঘবরণ করে দেবানন্দপুরের কেষ্টপুরে এই মেলা হয়। এই মেলা ৫১৩ বছরের পুরোনো।
চৈতন্য মহাপ্রভুর অন্যতম প্রধান শিষ্য রঘুনাথ দাস গোস্বামীর বাড়িতে বসা এই মেলাকে কেন্দ্র করে নানান গল্প কথা প্রচলিত। এই রঘুনাথ দাস গোস্বামী
ছিলেন, আদিসপ্তগ্রামের রাজার একমাত্র পুত্র। সংসারের সকল মায়া, ভোগ বিলাসিতা ত্যাগ করে তিনি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের অনুগামী হয়েছিলেন। প্রায় নয় বছর পর গৃহে ফিরলে তাকে পরীক্ষা করার জন্য ভক্তরা কাঁচা আমের ঝোল ও ইলিশ মাছ খেতে চায়। তার আদেশে বাড়ীর পাশের জোড়া আম গাছ থেকে আম ও পাশের পুকুর থেকে মাছ ধরা হয়েছিলো, তখন থেকেই সম্ভবত এই মেলার সূচনা হয়।
ইতিহাসের পাতা ও মাছ কে ভুলতে পারেনি। মুঘলরাও এদেশে এসে মাছের প্রেমে পড়েছিলেন। কথায় আছে “ মাছের রাজা রুই, শাকের রাজা পুঁই”।
আসলে ইলিশের স্বাদ নিয়ে কিছুই বলার না থাকলে ও রুই মাছের মতো নানা রকমভাবে ইলিশকে রান্না করা যায় না, আর কৌলিন্য বুঝতে পেরেছিলেন মুঘল সম্রাটরা। তাই বাদশাহরা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ “ মাহি মারাতিব” পুরস্কার দিতেন। এই মাহি বা মাছ হলো রুই মাছ। ধাতুর তৈরি
মাছের প্রতিকৃতিযুক্ত ফলক দান করে সম্মানিত করা হতো বীরদের।
স্বয়ং কবি ঈশ্বরগুপ্ত ও মাছের মহিমা বোঝাতে লিখেছিলেন,
“ ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল
ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল”।
আবার তিনিই তোপসে মাছের রূপ বর্ননায় লিখেছেন,
” কনককান্তি কমনীয় কায়,
গালভরা গোপদাড়ি তপস্বীর প্রায়”।
★আরও পড়তে চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে★
অনান্য লেখাঃ