“হাটের মানুষ বাটের মানুষ(পর্ব তিন)”–হাট দর্শন লিখছেন–কৃ ষ্ণা   মা লি ক

পরিচিতিঃ পূর্ব বর্ধমানের প্রত্যন্ত গাঁয়ের ধুলোমাটিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর। পায়ের তলার সরষেকে গড়িয়ে যেতে না দিয়ে জোর করে পিষে ফেলে ঘরে আটকে থাকা। কলমের কাছে মুক্তি চেয়ে নিয়েছিলেন। প্রকাশিত কবিতার বই কয়েকটি। একটি গদ্যের। এখন গদ্য দ্বিতীয় প্রেম। কৃৃৃৃষ্ণা, যাজ্ঞসেনী গুপ্ত কৃষ্ণা ছদ্মনামেও লেখেন। 

 

কৃ ষ্ণা   মা লি ক-র হাট দর্শন লিখছেন

 

হাটের মানুষ বাটের মানুষ(পর্ব তিন)

তিন
ছোটো একটি ঘাসফুল

বিদ্যাসাগরমশাই বলে গেছেন কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না।
আমরা গড়পরতা বাঙালি যতটা তমুকলালের দন্তমঞ্জনের বিজ্ঞাপন-বিকচিত দাঁত ‘খেলিয়ে’ ছবিতে মালা পরাতে পারঙ্গম ততটা মহাপুরুষদের আদর্শকে বহন করতে নয়। তাই যথেচ্ছভাবে আমরা মানুষের শারীরিক অসুবিধা নিয়ে রগড় করতে করতে তাদের বেদম রগড়াতে থাকি বিদ্যাসাগরমশাইকে কলা দেখিয়ে। তাতে অবশ্য গোমরামুখো পেটের সমস্যায় ভোগা বাঙালি একটু হাসির চান্স পায় বটে! তাতে তাদের হার্টে রক্ত চলাচল ভালো হওয়ায় হৃদয় বেশ ভালো থাকে, মানে বেশ তাজা থাকে আরকি! তো বাস্তবিকভাবে তো বটেই, বাংলা সিনেমা থেকে শুরু করে, নাটক থিয়েটার উপন্যাসে পর্যন্ত –সর্বত্র মানুষের শারীরিক এবং মানসিক অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে চুটিয়ে এইভাবে বাওলামোর ট্রাডিশন চলেছে। কেউ তোতলা হলে তাকে যে কতটা পরিমাণে বেইজ্জত হতে হয় তা যিনি ওই সমস্যার ভেতর রয়েছেন তিনিই জানেন, আর ভগায় মালুম। তাঁর সম্মান অন্যের কাছে জাস্ট পাপোষ। বেশ করে তাতে পা মুছে তাঁর পরণের কাপড় খুলে তাঁকে নাঙ্গা করে ছাড়েন সমাজবদ্ধ জীবেরা।
তা এঁড়ে তক্কো করাই যায়।বলতেই পারেন, যিনি কানা বা খোঁড়া তবে তাকে কী বলব বলুন তো? ডাকলে বা বললে তার রাগ করারই বা কী হলো রে বাওয়া!
আসলে আমরা হলুম গে’ ন্যাকা ষষ্ঠীচরণের তুতো ভাইবোন। আরে–যে চক্ষুষ্মান–আক্ষরিক অর্থে আর কি! অন্য অর্থ ধরলে – আমরা সবাই এক চোখ নিয়েই ডাঁটসে ঘুরিফিরি। তো চক্ষুষ্মানকে কানা বললে থোড়ি কাতরাবে! সে জানে তার চোখে অনেক তীর ধনুক আছে, সে রাগের পরোয়াই করবে না। আমরা যা নই, তা বললে তত গায়ে লাগে না। সাত বেটার মাকে আঁটকুড়ি বললে তিনি তাঁর ছেলেদের গালে চুমো খাবেন হাসতে হাসতে, কিন্তু যিনি একটি সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় চোখের জল ফেলে চলেছেন গোপনে তাঁকে এ কথাটা বললে জ্যান্তে শেল বিঁধে আধমরা করা হয় নাকি?
তেমনই মানুষ আকারে ছোট হলেই আমরা কেন জানি না তাদের জীবন ও অনুভূতি বিষয়ে খন্ডিত ধারণা পোষণ করে ফেলি।যেন তাঁরা আকারে ছোট বলেই তাঁদের আনন্দ বেদনাও পরিমাণে কমে যায় –আকারে প্রকারে ছোট হয়ে আসে। চিত্র পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি এনাদের বিষয়ে সিনেমা বানিয়েছিলেন একটা, অনেকেই জানেন নিশ্চয়ই, – “ছোটদের কথা”। সেখানে ক্ষুদ্রকায় মানুষদের সম্পর্কে যে ধরণের কথাবার্তা বলছেন বা ইঙ্গিত করছেন তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মানুষেরা, তাতে বরং তাঁদেরই অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ছে। ধরা পড়েছে তাঁদের মানসিকতা ও চিন্তার দৈন্য। কৌশিকবাবুর শিল্পীহৃদয় ও নিটোল মাখমচাকু দৃষ্টি আমাদের কর্ণিয়ায় না সেঁধোলে সে আমাদেরই চালসে। তবে গাঙ্গুলিদারা হলেন ব্যতিক্রমী। যা ব্যতিক্রমী তা নিয়মের সারি থেকে সতত সটকান দেয়।
শেখ জাহাঙ্গির এমনই একজন যুবক।যার শরীরের উচ্চতা সাড়ে তিন ফুট।উফ! কী মারাত্মক অপরাধ বলুন তো? তার শরীরটা ছোট বলে তার খিদে তেষ্টা আলসারের জ্বালা যন্ত্রনা যৌনকাতরতা সবই ‘নিশ্চয় হাফ’! হয়তো মানুষটাই “হাপম্যান”! তো ভাবছেন নিশ্চয়, তাকে আমি কীকরে পেলাম? বলছি।

সেদিন মনে হলো বেড়ুগ্রামের হাট থেকে একবার ঘুরেই আসি।ব্যাস! উঠল বাই তো হাটেই যাই! গাঁয়ের ছেলে টোটোচালক, তাকে ডেকে উঠে বসলুম টোটোয় – চালা তোর পানসি।
সে ভয় দেখিয়ে দিল, বেড়ুগ্রাম তো অনেক দূর গো, দিদি! প্রায় এক ঘন্টা লাগবে।
“তা লাগুক, তুই চ’ দিকিনি!” আমি মাথামোটা, বাস ধরলেই ফুরিয়ে যায়, বাসেরও আকাল পড়েনি।তবু, ওই! টোটো।
তো হাট বললেই সেই বক্সীগঞ্জে পদ্মাপার মনে পড়ে। নয়তো যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের – দূরে দূরে গ্রাম দশ বারোখানি মাঝে একখানি হাট / সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ নিশীথে পড়ে না ঝাঁট ”। নাহ্! এ সেসব নয়। চারদিকে জনসংখ্যা যে হারে বেড়ে চলেছে, তাতে দূরে দূরে দশ বারোখানা গ্রামের মাঝে একটি হাটের ছবি বড্ড বেল্লিকের মতো বেহিসেবী ভাবনা হয়ে যাচ্ছে না? বিশেষ করে জনবসতির ঘনত্ব যেসব জেলায় বেশি। আর সেই কারণে ধরাদ্ধর গাঁ-গঞ্জ গায়ে গতরে বেড়ে বড্ড গা ঘেঁসাঘেঁসি পর্যায়ে চলে এসেছে। বেড়ুগ্রামেও বাস রাস্তার গায়ে এবং গাঁয়ের গায়ে এই হাট বসে।সড়কের একদিকে হাট। হাটের পুব দিকে বড়ো একখানা পুকুর, পশ্চিম দিকে নয়ানজুলি, নয়ানজুলির গায়ে কিছু গাছপালা ছায়া ফেলে আর একটা পুকুরের সঙ্গে গা ঢলাঢলি করছে। মাঝারি হাট।সেহারার হাটের মতো বড়ো ও বৈচিত্রপূর্ণ না হলেও সেখানেও প্রায় একই ধরণের পণ্য কেনাবেচা হয়। তবে গরু-মোষ-ছাগল হাঁস-মুরগি, দাদের মলম, শুঁটকি মাছ, লোহালক্কড় এসব দেখা গেল না অবশ্য। স্থানীয়রা জিনিসপত্র, বিশেষ করে আনাজপাতি, মাছ এসব রসদ নিয়ে আসেন, ক্রেতাও স্থানীয়। দু-একজন পাইকারি মশলা ব্যবসাদার ও জামাকাপড়ের ব্যবসায়ী বর্ধমান শহর থেকে এসেছেন। আর বিভিন্ন শাক সব্জির বীজ নিয়ে এসেছেন কাইতি থেকে এক বয়স্ক মানুষ।
দেখলাম একপাশে কচি তাল বিক্রি হচ্ছে। পুরো পরিবার মিলে ব্যবসা। ব্যবসাই তাদের উপার্জনের উৎস নয়। মাঝে মধ্যে বিশেষ বিশেষ পণ্য তারা হাটে এনে বিক্রি করে দুটো বাড়তি পয়সার আশায়। এই তাল চুক্তিমতো কারও গাছে উঠে কেটে এনে হাটে বেচা। বড় খদ্দেরকে তাল কেটে দিচ্ছে কাটারি দিয়ে, বউ টাকার হিসাব রাখছে। ফাঁকা খোল কুড়িয়ে বস্তায় ভরছে তাদের ছেলে। গরমের দিনে এমন একটা দেহ ঠান্ডা রাখার মরশুমী দাওয়াই মোটে চার টাকা করে দাম? বুঝলাম ডাবের মতো কুলীন তো নয়, বড়োই এলেবেলে গেঁয়ো জিনিস বটে! তবে যারা জানে তারা জানে। খুব বেশি সময় লাগল না, তাল বিক্কিরি হয়ে গেল সব। কেউ কেউ বাড়ির জন্য এক-দু কাঁদি কিনে নিলে।
গাঁয়ের লোক আমরা হলে কী হবে, তাল খেজুর জাম আতা এই ধরনের ফলগুলো ধীরে ধীরে কবে যেন হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এসব গাছ কমে গেছে, প্রধানত। দ্বিতীয়ত, ওই তাল-খেজুর-জাম-আতা শাকটাক শামুক-গুগলি কাঁকড়া-টাঁকড়া ডুমুর কুলেখাড়া ইত্যাদি যেসব দ্রব্য হেলাফেলায় মেলে সেসব সাধারণত শহরের বাজারে মাসি-দিদিরা নিয়ে চলে যায়। সেখানে বাজারের একপাশে বসে আরামসে বেচে ফেলে। গাঁয়ের লোক হয়েছে কুঁড়ের হদ্দ। এগুলো নিজেরাও জোগাড় করবে না, আর বাজারে শাকতুলুনি মাসিপিসিরা দুটো পয়সা বেশি চাইলেই চোখ টাটাবে। তো লেহহ্! বাসে চড়ে বর্ধমানের কলেজ মোড় বা তেঁতুলতলা বাজার, বা স্টেশন বাজারই সই। তাই বেশ লোভীর মতো সেদিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম।
সেখানেই দেখি জাহাঙ্গীরকে। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে শুকনো মুখে। চোখাচোখি হতে চোখ সরিয়ে নিলো। আমি দুজনের জন্য তাল কেটে দিতে বলেছি, তাল কাটছে। আমার চোখ না চাইতেও আবার সেই ছোটখাটো ছেলেটির দিকে পড়েছে। দেখি সে আমারই দিকে তাকাচ্ছে। আমি আরও একজনের জন্য তাল কাটতে বলে এগিয়ে গেলাম।
পাশের গ্রামে বাড়ি। করুণ, শুকনো মুখে সে-ও ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। মাটির দিক থেকে চোখ তুলে তাকাতেই পারছে না। খুব সঙ্কোচের সঙ্গে বলে, দিদি, আমায় কিছু টাকা দেবে?
মনে মনে বলি, হায়রে আমার পোড়া দেশ! আমার পোড়া দেশের ব্যবস্থা! এখানে কত কত কারণ এবং অ-কারণে আগুন জ্বলে। কখনও ইচ্ছা করে শাসকও জ্বালিয়ে দিয়ে থাকেন। কিন্তু মানুষের পেটের আগুনের হদিশ রাখে না কেউই। নিরন্তর জ্বলতে থাকা সেই আগুন নেবানোর চেষ্টাও কোথাও নেই।
এরপর কী কথোপকথন হলো প্রিয় পাঠকদের তা খুব একটা জানার দরকার নেই। শুধু এটুকুই জানুন, সে ছোটোখাটো মানুষ বলে তার কাজ পাবার অধিকার কম। কেউই কাজে নিতে চায় না তাকে, তার কাছ থেকে পুরো কাজ পাওয়া যাবে না এই আশংকায়।জাহাঙ্গীর বলল, “কেউ কাজ দেয় অল্প মজুরিতে, বেশির ভাগ লোক কাজ দিতে চায় না। ভাবে, আমি অন্যদের মতো ভালো ভাবে কাজ শেষ করতে পারব না।”
সংসার চলে কীকরে?
চেয়ে-চিন্তে।অল্প স্বল্প কাজ লোকের গায়ে পড়ে হলেও, কম মজুরিতে হলেও জোগাড় করতে হয় আমাকে।আসলে সংসার চলে না, দিদি! বাবা যতদিন বেঁচেছিল আমাকে অতটা ভাবতে হয়নি।এখন আমি জলে পড়ে গেছি, কী করে সব দিক সামলাই তার ঠিক নাই!

সে সাইকেল চালাতে পারে না; হাতে পায়ে ব্যথা হয় মাটি কাটা, রাস্তা করার কাজ করলে। হাতে পায়েও খুঁত আছে। মাথায় করে জিনিস নিয়ে ফেরি করতে চাইলেও ভিন গাঁয়ে বাচ্চাদের খ্যাপানোর চোটে সে ইচ্ছেয় জল পড়ে। কয়েক মাস বয়সের মেয়ের পেট খারাপ আর জ্বর। ডাক্তার দেখানোর জন্য টাকাটা তার দরকার।
মুখ দেখে বয়স বোঝা যাচ্ছে, অবয়ব দেখে নয়। বয়স হবে হয়তো বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশ। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ভেতরটাও পড়ে ফেললাম আমি, হয়তো বা! সে নিজেও খুব সম্ভব সুস্থ নয়।চোখ দুটো চাপা কষ্টে লালচে হয়ে উঠল তার।ভেতরে সে যেন সর্বদা ক্রন্দনশীল।
বাড়ি ফেরার সময় আফশোস হয় একবার।ইসস! জানা হলো না ওর মা আর বৌএর কথা! তারাও কি ওরই মতো উচ্চতার মানুষ, নাকি স্বাভাবিক উচ্চতার? তারপরই নিজেকে শাসন করি।কী এসে যায়? তাদের উচ্চতা কম বেশিতে? তাদের জীবনে অভাব অভিযোগ সুখ দুঃখগুলো তো তাতে গগনস্পর্শী বা পাতালভেদী হয়ে উঠবে না কারও কাছে? আমি তার সমাধানও করে ফেলতে পারব না। আসলে এও কি আমার একধরণের পাতি কৌতুহল নয়? যেটা মানুষের অসহায়তা সেদিকটাতেই প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে মিনিমাগনায় সার্কাস কা খেল দেখার শখ? ভেবে লজ্জা পাই। তাই কয়েক মুহূর্তের দেখায় পথের আত্মীয়তাটুকুর সম্মান বজায় থাক।
কেনাবেচা শেষে হাটতলা যেমন বাকি দিন ক’টা নীরব ও অব্যয়, তেমনই একপাশে নীরবে পড়ে থাকা ওই মানুষগুলি। তাদের জীবনের তরী ভয়াবহ সমুদ্রে ভেসে চলেছে কূল খুঁজতে। আমি আর কী করতে পারি? পাড়ে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিষণ্ণ মনে কেবল বলি, যাত্রা শুভ হোক।

লেখা পাঠাতে পারেন

আগের পর্বগুলি পড়তে নিচের লিংকে যান

হাটের মানুষ বাটের মানুষ(পর্ব দুই) লিখছেন–কৃ ষ্ণা   মা লি ক

 

হাটের মানুষ বাটের মানুষ(১ম পর্ব)–লিখছেন- কৃ ষ্ণা মা লি ক

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *