সৌ মি ত্র চ ক্র ব র্তী-র ছোটগল্প “এ শহর প্রান্ত”

পরিচিতিঃ জন্ম বিহারের এক অখ্যাত বনাঞ্চলে বাবার চাকরীস্থলে। রসায়নে স্নাতকোত্তর এবং ম্যানেজমেন্ট পাশ করে কিছুদিন সাংবাদিকতা। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মচারী। একাধারে নাট্যকার, কবি এবং গল্পকার। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, পুস্তক পর্যালোচনা , বিভিন্ন ধরনের লেখা ছড়িয়ে আছে দেশ বিদেশের অসংখ্য পত্র পত্রিকায় ও সংবাদপত্রে। উৎপল দত্ত সহ বহু বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্বের কাছে শিখেছেন থিয়েটার। বহু বিচিত্র ও ব্যাপ্ত ময় তাঁর জীবন। বন, জঙ্গল, পশু, পাখি ,বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাথে তাঁর দীর্ঘকালের নিবিড় ও অন্তরঙ্গ পরিচয়। কবিতা ও বিভিন্ন লেখা লেখিতে তিনি মস্তিস্কের থেকে হৃদয়ের ভুমিকাকে বড় করে দেখেন। কবিতা, গল্প, নাটক এবং মুক্তগদ্য মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা নয়। প্রকাশিত গ্রন্থগুলি হলো বইছে লু, থিয়েটার কথা, তিতলিঝোরা, নীলপাখিকে উড়ো চিঠি, রাত্রি আমার নৈশপ্রিয়া, ব্রিজের নীচে বৃষ্টি, ২ একাঙ্ক, প্রতিলিপি এবং বেবুশ্যে চাঁদ, খণ্ড ক্যানভাস। ইতিপূর্বে অঙ্গন সহ কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। বর্তমানে অক্ষর বৃত্ত পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। নেশা ফটোগ্রাফি ও ভ্রমণ।

 

সৌ মি ত্র    চ ক্র ব র্তী-র ছোটগল্প

এ শহর প্রান্ত

 

তক্তাপোষের ওপর এক হাঁটু মুড়ে অন্য পা টা সামনে ছড়িয়ে বসেছিল রনি। আনমনে পায়ের বুড়ো আঙুলের নখের কোনের চামড়া খুঁটে খুঁটে ছাড়ানোর চেষ্টা করে চলেছিল, যদিও অত মোটা চামড়া একটু খোঁচা হয়ে উঠে আর ছাড়ছিল না। বেশি জোরে টানলে লাগছিল, আর তখনই চমকে হাত সরিয়ে আনছিল ও। কিন্তু আবার একটু পরেই হাতটা সেখানে চলে যাচ্ছিল অজান্তেই।
সামনে উঁচু একটা পড়ার টেবিলের ওপর রাখা টিভি তে ইস্টবেঙ্গলের খেলা হচ্ছে টালিগঞ্জ অগ্রগামীর সঙ্গে। বেশ বেগ দিচ্ছে দলটা। রনি আবার ইস্টবেঙ্গলের কট্টর সাপোর্টার। সুযোগ পেলেই ক্লাবহাউসের টেন্টে ঢুকে পড়ে। ভাবও জমিয়ে নিয়েছে কয়েকজনের সঙ্গে। এখন সবই তেলের যুগ। খিক খিক করে আপনমনেই হেসে উঠল ও।
পুরনো সাবেকী ঢঙের দোতলা বাড়ী। তৈরী করেছিল রনির ঠাকুরদা। জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা চটে গিয়ে ইট দাঁত বার করেছে। কোথাও নোনার স্পষ্ট ছোপ। ছাদের বেশিরভাগ অংশই শ্যাওলার মোটা আস্তরণের দখলে। কতদিন যে রঙ হয়নি ঠিক মনেও করতে পারে না কেউ। কালিঘাটের এই অঞ্চলটা এখনো পড়ে আছে সেই মান্ধাতার আমলের ভাবনা চিন্তায়। ওপরে ওপরে বড় রাস্তার ধারে অনেক চকচকে দোকান, শোরুম, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট হলে কি হবে, গলির মধ্যে কিম্বা মন্দিরের সামনের জগতের মানুষগুলো এখনো সাবেক ঘি এর গন্ধ শুঁকেই দিন কাটায়। এখানে মার্জিত সুরে কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেনা। চিৎকার করে হামেশাই একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করা আর সেই কুৎসিত কোলাহল উঁকিঝুকি মেরে উপভোগ করা এখানকার স্বাভাবিক দস্তুর। এখানে সম্প্রতি যারা বাড়ী করেছে, তাদের এই পুরনো বাসিন্দারা বহিরাগত উপদ্রব মনে করে তাচ্ছিল্য করে।
রনি নিজেও ওই ভাবধারার শরিক। সেখানে সে বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক। নিজেরটুকু গুছিয়ে নিতে পারলেই হল। এত বড় বাড়ীর দেখভাল করার মত কেউই আর নেই। শরিকদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে, তারা অন্য জায়গায় ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে। পড়ে রয়েছে রনি আর তার জ্যাঠতুতো ভাই অনীক। সে এখনো বিয়ে থা করেনি। আর করবেও না মনে হয়। প্রায় পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই অনীক সল্টলেকে একটা সরকারী অফিসের কেরানি। বাড়ী বা সংসার সম্পর্কে তার কোনো আগ্রহই নেই। সন্ধের অনেকপরে বাড়ী ফিরে সোজা একখানা বোতল খুলে বসে। সাথে অফিসফেরতা আনা টুকটাক খাবার আর একটা বই কিম্বা নতুন কেনা ট্যাব। এ বাড়ীর ঐতিহ্য যদিও সেরকম কিছুই নেই কিন্তু সেসম্পর্কে তৈরী করা কিছুটা টনটনে অহংকার তার মধ্যেও আছে।
গোওওল… যাহ! টালিগঞ্জ গোল দিয়ে দিল ইস্টবেঙ্গলকে। নড়েচড়ে বসল রনি। বিড়বিড় করে গাল দিল কাউকে। এই পুচকে দলগুলোর কাছে গোল খাওয়ার আগে এরা আত্মহত্যা করে না কেন? চোখদুটো ঈগলের মত তীক্ষ্ণ করে তক্তাপোষ থেকে ঝুঁকে পড়ে দেখতে থাকল সে। পারলে হয়তো টিভির মধ্যে ঢুকেই পড়ত।

উফ! অনেক দেরী হয়ে গেল। আরো জোরে পা চালাল সম্পাতি। এই কলকাতার ফুটপাতে তাড়াতাড়ি হাঁটাও যায়না। এখানে গর্ত, সেখানে নোংরা আর হকারের দৌরাত্য … ধুস শালা…এখানে কেউ থাকে! বিড়বিড় করল আপনমনেই। টালিগঞ্জ ট্রামডিপোর মোড়ে এসে রাস্তা পেরোনোর জন্যে দাঁড়িয়ে গেল। হুশ হুশ করে গাড়িগুলো প্রায় গায়ের ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছে। এই হতভাগা দেশে কোনো সিস্টেম তৈরী হলোনা এখনো। আর হবেও না কোনোদিন। এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথাও কোনো ট্র্যাফিক পুলিশের চিহ্নও দেখতে পেলনা সে।
থেমেছে। চটপট পা চালিয়ে রাস্তা পেরিয়ে এপাড়ে মেট্রোর সাইডে এল। ঘড়িটা দেখল একবার, বিকেল চারটে বাজে প্রায়। সাড়ে পাঁচটার ট্রেন ধরা যাবে কি? সামনে একটা বাস থেকে কন্ডাকটর চিৎকার করে যাচ্ছে- হাওড়া…হাওড়া…হাওড়া…! আর না ভেবে পাদানিতে পা রাখল ও, আর আশ্চর্য উঠেই সিট পেয়ে গেল। কলকাতার পুরনো আমলের এই বাসের সিটগুলোও একেবারেই পছন্দ নয় তার। সেই মান্ধাতার আমলের দুদিকে লম্বা লাইন করে বসার সিট। অন্যদেশের কথা ছেড়েই দেওয়া যাক, এই পশ্চিমবঙ্গের অন্য শহরে কিম্বা গ্রামাঞ্চলেও এই বাসগুলো আর দেখা যায়না। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে উঠলো সম্পাতির।
আসলে এখন যা দেখছে তাতেই বিরক্ত লাগছে। দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমনো উচিৎই হয়নি তার। মোবাইলে একটা অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হত। সিগন্যালে আটকেছে বাসটা। অধৈর্য হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে দেখল সে। কাতারে কাতারে গাড়ি দাঁড়িয়ে সামনে।
কাল দেশপ্রিয় পার্কে অনেকক্ষণ বসেছিল শাখার সঙ্গে। সেই একই টুকটাক কথা হতে হতেই শাখা অনর্গল হয়ে গেল। নিজের কথা, ছেলেবেলার কথা, ওর বাবার কথা, মায়ের কথা, জেঠুমনি, পাশের বাড়ির তাতাই এর কথা গড়গড় করে বলে যাচ্ছিল। ঘটিগরমের ঠোঙা থেকে একটু একটু খেতে খেতে মন দিয়ে শুনছিল সম্পাতি। খুব মন দিয়ে কিছু শুনলেই তার চোখের সামনে ছবিগুলো পরিস্কার ফুটে ওঠে। সিনেমার মত সব ঘটে যাওয়া অতীত সরে সরে যায়, পিছলে যায়। একাত্ম হয়ে যায় তখন সে।
শাখার হাতের তালুটা বেশ শক্ত। ওর শ্বশুরবাড়ির প্রায় সব কাজই তাকে করতে হয়। আসলে ও বাড়িতে শাখার জায়গা কাজের লোকের প্যারালাল। ওর স্বামীটা একেবারেই অপদার্থ। মোটামুটি সবকিছুই শোনা হয়ে গেছে সম্পাতির।
হাত তুলে কুলফি ডাকলো ও। দুটো দিতে বলে একটা সিগারেট ধরালো। ঘাসের সামান্য রেখার ওপরে বসে আছে ওরা দুজন। পার্কের বাইরের রাস্তার একটা অংশ দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। এদিক ওদিক গাড়ি চলে যাচ্ছে। আচ্ছা এখানে পাখি আছে?
এবারে মাত্র দুদিনের জন্যে এসেছিল সে। চাকরীসূত্রে সম্পাতি থাকে বীরভূমের রামপুরহাটে। লালমাটির দেশে প্রচুর খোলামেলা জায়গা, পাখপাখালি তাকে অভিভূত করে দেয়। আজন্ম এই কলকাতার মানুষ সে। পড়া কমপ্লিট করে প্রথম চাকরী পেয়ে বাইরে গেছিল, তাও প্রায় বছর দশেক হয়ে গেল। কিন্তু সেও কাঠখোট্টা গুজরাতের এক শহর, মেহসানা। বাংলার প্রাম যে একেবারেই দেখেনি তা নয়। দু একবার বন্ধুদের সঙ্গে আশেপাশের গ্রামের কোনো ট্যুরিস্টস্পটে গেছে পিকনিক করতে কিম্বা বেড়াতে।কিন্তু আপাদমস্তক গ্রাম কে এভাবে উপভোগ করা, শরীরে মনে মেখে নেওয়া আগে কখনো হয়নি।
রামপুরহাটে সে যেতেও চায়নি। কিন্তু নতুন এই চাকরীটা বেশ বড় কোম্পানীতে, আর অফারটাও বেশ শাঁসালো। কলকাতা থেকে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দূরে শুনে কি হয় দেখি একবার গোছের মনোভাব নিয়েই গেছিল সে। আর গিয়েই জাস্ট প্রেমে পড়ে গেছে জায়গাটার।
শাখার সঙ্গে ওর আলাপ ফেসবুকে। সন্ধের পরে ওখানে বিশেষ কিছুই করার থাকেনা। ওখানে খুব একটা বন্ধুও নেই তার। কাজের সূত্রে যা কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ। তার বেশি কখনোই এগোয়নি কোনো সম্পর্ক। তাই সময় কাটাতে সন্ধের পরে ফেসবুক খুলতে শুরু করেছিল সে। প্রথম প্রথম শুধু পড়ত, দেখত। তারপর গুড ইভনিং, গুড নাইট। আর এভাবেই কিভাবে কখন যেন আলাপ হয়ে গেল শাখার সঙ্গে এখন আর ঠিক মনেও করতে পারবে না সে। সেখানেই ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাটে কেটে যেত। কখনো মেয়েদের সাথে সেভাবে না মেশার জন্যে ওদের মন, চাহিদা, কল্পনা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না সম্পাতির। কথায় কথায় জল গড়িয়ে সম্পর্ক কখন যেন গাঢ় হয়ে গেল। শাখার হাতের আঙুল নিয়ে নাড়াচাড়া করে সম্পাতি।
পঁয়তাল্লিশ ছুঁল সে এই লাস্ট জুনে। বাড়িতে দাদা আর বউদি। দাদার মেয়েরা বিয়ে হয়ে বিদেশে। এখানে আর ফিরে আসার চান্স খুবই কম। দাদাও রিটায়ারমেন্টের পরে ক্লাব নিয়েই মেতে থাকে। আগে আত্মীয়রা বিয়ের কথা বলত ওকে। ঠাট্টা তামাশাও করত। এখন ওরাও ফেডআপ হয়ে ছেড়ে দিয়েছে ওসব বলা। ধরেই নিয়েছে এরকমই অবিবাহিত হয়েই থেকে যাবে সম্পাতি। আসলে এতদিন মেয়েদের সম্পর্কে খুব একটা উৎসাহ ছিল না ওর। মেয়ে মানেই বাধা এই ধারণাটা ওর বদ্ধমূল ছিল। আস্তে আস্তে শাখার সঙ্গে আলাপের পরে সব কেমন যেন পাল্টে গেল। সাদাকালো স্কেচের ওপরে রঙের আলতো টান লাগতে শুরু হল।
শাখার জীবনটা ওর খুব অদ্ভুত মনে হয়। ওর বাপের বাড়িও কেমন যেন উদাসীন। দুই বাড়িই প্রাচীন মানসিকতার কূপমন্ডুকতায় পড়ে আছে এখনো এই একুশ শতকেও। কলকাতা শহরটাকে সম্পাতির মাঝেমাঝে গ্রাম মনে হয়। যতই ঝাঁ চকচকে হোক ওপরটা, ভেতরে ভেতরে মানসিকতা পড়ে আছে সেই মধ্যযুগেই। শাখার বাপের বাড়িতে যেমন মনে করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে আপদ নেমে যায় ঘাড় থেকে। তেমনি শ্বশুরবাড়িও মনে করে বাড়ির বউএর কদর কাজের লোকের বেশি নয়। আশ্চর্য, এদিকে লোকটা কিন্তু শাখার রোজগারেই বসে বসে খায়।
-“উঠবে না? অনেক রাত্রি হলো তো! না ফিরলে আবার চিৎকার …”
শাখার কথায় হুঁশ ফিরলো সম্পাতির।
-“হ্যাঁ চল”।
টেনিস কোরটের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শাখার ডানহাতের তালুটা বাঁ হাত দিয়ে মুঠো করে ধরলো সে। শাখাও আঁকড়ে ধরলো ওর হাত। কালিঘাটের গলিতে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে শাখাকে।
নভেম্বরের মাঝামাঝি এখন, অথচ হিমের কোনো রেশ নেই এই মহানগরে।

একটা মানুষের আইডেনটিটি কি? একটা ভোটার আইডি? একটা আধার কার্ড কিম্বা প্যান কার্ড, পাসপোর্ট? কয়েকটা কাগজের টুকরো বা কয়েকজন সাক্ষী কি একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে? আইডির ফটো থেকে চেনা যায় মানুষটা কেমন?
সে বা তার বাবা, মা কেউই তো রনি কে চিনতে পারেনি কখনো। বিয়ের আগে প্রায় বছর তিনেক একটানা ওদের সিথির বাড়িতে যেত রনি। ভুরিভুরি মিথ্যে বলতো সেসময়। সে নাকি বিশাল আর্টিস্ট। প্রেসিডেন্সির ছাত্র, প্যারিসের ডিপ্লোমা আছে। বড় বড় এক্সিবিশন করে সে, যেগুলো উদ্বোধন করেন বিশাল মাপের বিশিষ্ট মানুষেরা। অবাক হয়ে সেসব শুনত ওদের বাড়ির সবাই। ওর বোন তো রীতিমত ফ্যান ছিল রনির। তারপর যেদিন রনি বিয়ের প্রস্তাব দিল ওদের বাড়ির সবাই যেন হাতে চাঁদ পেল। ও নিজেও বিভোর হয়ে গেছিল এক বিশাল আর্টিস্ট কে নিজের করে পাবে ভেবে। আগুপিছু কোনো খবর না নিয়েই এক অশুভক্ষণে বিয়েটা হয়ে গেল তার।
হ্যাঁ, তার বিয়েই বলবে সে। কারন রনি কোনোদিনই নিজেকে বিবাহিত ভাবেনি। বিয়ের কিছুদিন পরেই এটা বুঝতে পেরেছিল শাখা। আসলে রনির দরকার ছিল ওর মা কে দেখাশোনা করার জন্যে একটা বিনে মাইনের আয়া আর রান্নার, বাসন মাজার কাজের লোক। বিনেমাইনের, কারন রনির কোনো রোজগার ছিলনা। সব মিথ্যে কথা বলেছিল। সে আদৌ শিল্পী নয়, বলতে গেলে কিছুই নয়। পড়াশোনাও মাধ্যমিকের গন্ডীর এদিকে। আর রীতিমত দুশ্চরিত্র। প্রথম যেদিন একতাড়া চিঠি ঘর পরিস্কার করতে গিয়ে হাতে পেল, সেদিন ছুটে গিয়ে রনিকে জবাবদিহি করেছিল স্ত্রীর অধিকারবোধ নিয়েই। কিন্তু রনি চিঠিগুলো হাত থেকে কেড়ে নিয়ে যখন সপাটে গালে চড় মারলো, যেন বাজ পড়েছিল ওর মাথার কোষের মধ্যেই। রনির বাকী চিৎকার আর ওর মাথায় ঢোকেনি। পরে যতবারই ফোনে মা বাবাকে এসব কথা বলেছে, তাঁরা গম্ভীর হয়ে অ্যাডজাস্ট করতে বলেছেন ওকে।
কতভাবে অ্যাডজাস্ট করতে পারে একটা মেয়ে? রাত্রির এই নির্জন সময়ে একা ছাদে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল শাখা। এই ছাদ আর এই রাত্রি ওর বন্ধু, ওর আশ্রয়। যখনই কোনো মানসিক বিচ্যুতি ঘটে ওর, পালিয়ে আসে এই ছাদে। এখনো পর্যন্ত কোনো ইস্যু হয়নি ওর। রনি ওকে যেমন আজ পর্যন্ত হাতে তুলে কোনো উপহার দেয়নি, তেমনি দিতে পারেনি স্বামী-স্ত্রীর সেরা উপহার। আসলে বহুগামিতায় নানারকম রোগের শিকার হয়ে পড়েছে সে। যে কয়েকবার সে রনির কামনার শিকার হয়েছে, লক্ষ্য করেছে তার আগে রনিকে ওষুধ খেতে হয়েছে। তবুও কখনোই শেষরক্ষা করতে পারেনি সে। নিজের কামনাটুকু চরিতার্থ কোনোরকমে করেই ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজের তক্তাপোষের ওপরে। ওপরে সেই বিছানায় শোবার অধিকার ছিলনা শাখার। এখন অবশ্য সেই ঘর ছেড়ে দোতলায় একচিলতে চিলেকুঠুরিই তার জায়গা। ছোট্ট, তাহলেও অন্তত একা নিজের মুখোমুখি হতে পারে এখানে সে। আর খুব বিচলিত হলে, কিম্বা নির্ঘুম এইসব রাতে চলে আসে ছাদে। তাকিয়ে থাকে আকাশের তারাদের দিকে। কথা বলে ওদের সঙ্গে, নিজের সঙ্গেও। আজও গায়ে হাত তুলেছিল জানোয়ারটা। আঁকছিল শাখা। ছোট থেকেই আঁকার শখ তার। কিন্তু এখানে এসে সব জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। রনি তো কিছু রোজগার করেনা। অথচ তার চাহিদা আকাশ ছোঁয়া। প্রথম প্রথম বাবার কাছে হাত পাততে হত। কিন্তু তারপর বাবার বিমুখতা আঁচ করে এখন নিজেই টিউশন শুরু করেছে। পড়ানোর আর আঁকার। মোটামুটি চলে যায় এতেই। কিন্তু যা পায় তার বেশিরভাগটাই রনি কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যায়। কোনোরকমে কিছু বাঁচিয়ে সংসার চালাতে হয় তাকে। অথচ সেই আঁকাটাই সহ্য করতে পারেনা জন্তুটা। হয়তো তার নিজের বলা মিথ্যেগুলো মনে পড়ে যায়। আজ যখন একমনে আঁকছিল, কখন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল রনি, বুঝতে পারেনি। সাধারণত ওকে লুকিয়েই ছবি আঁকে সে। হঠাৎ কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে হাতে জোরে একটা ঘুষি মেরে বসলো রনি। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠেছিল সে। এখনো হাতের কব্জির ওপরটা ফুলে আছে। দুচোখ ভরে জল এল শাখার। ওপরে তাকিয়ে বলল, আর কত?
নিজের শৈশব, যৌবন সব যখন প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছিল ঠিক সেই সময়েই সম্পাতির সঙ্গে ওর পরিচয়। আশ্চর্য ক্ষমতা মানুষটার, ওর সঙ্গে কথা বললে সব ভুলে যায় সে। তার নিত্যকার ক্লেদ, গ্লানি, ক্ষোভ কিছুই লুকায়নি সে সম্পাতির কাছে। প্রায় একবছরে আস্তে আস্তে কখন যেন সে তার আশ্রয় হয়ে উঠেছে। রোজ ফোনে কথা হয় দুজনের। কিন্তু একটাই মুস্কিল বড় অবুঝ আর অভিমানী সম্পাতি। ওকে বোঝাতে হয় সবকিছু। আর এই বোঝানোতে এই এতদিন পরে তৃপ্তি পায় শাখা। এতদিনে সে পূর্ণ নারী হয়ে উঠছে।


ওয়ালেটটা খুলে দেখল রনি।মাত্র পঞ্চাশ টাকা পড়ে আছে। মাগীটা এখন কিছুতেই হাত উপুড় করতে চাইছে না। কি ব্যাপার কিছুই আঁচ করতে পারছে না সে। কোনো চক্কর চালাচ্ছে নাকি? কয়েকবার বন্ধ দরজায় আড়ি পেতে মনে হয়েছে কারো সাথে কথা বলছে ফোনে। এইসব বুদ্ধি নিশ্চয় সেই নাগরই দিচ্ছে। রাগে গা কিসকিস করে উঠলো রনির।
শালীকে বিয়ে করে আনার পরে বেশ বাধ্য ছিল। বাপরে! অনেক ভুজুং ভাজাং দিতে হয়েছে ওর বাপ মা দুটোকে। হেব্বি মালকড়ির টোপ দিয়ে তবে কাজ হাসিল হয়েছিল। মাগীটাকে প্রথম দেখেছিল ওদের পাড়ায় একটা ছবির একজিবিশনে। ওখানেই মাথায় বুদ্ধিটা আসে। তারপর আর্টিস্ট সাজতে ওর বেশিক্ষণ লাগেনি। আর টুপি পরানো ওর কাছে জলভাত। কিন্তু সেই বাধ্য মেয়েটা কি করে যে গত একবছরে পাল্টে যেতে শুরু করল, তার থই খুঁজে পায়না সে। যে মালটা এইসব বুদ্ধি দিচ্ছে হাতের কাছে পেলে সেটাকেও ঠ্যাঙাত সে। নিজের পিপের মত পেটটা সামনে বিছিয়ে ভাবতে বসলো রনি। কিভাবে এখন কিছু হাতানো যায়। সন্ধেয় মনিকার সঙ্গে মোলাকাতের টাইম দেওয়া আছে। খালি হাতে তো যাওয়া যায়না। অলরেডি যা গয়না ছিল চুরি করে ঝেড়ে দিয়েছে সে। আলমারীতে দামী শাড়ীগুলোরও একই অবস্থা। এখন…!
এখন চারদিকেই খারাপ সময় চলছে তার। ক্লাবে ওর ব্যাকিং সতুদাটা পট করে অ্যারেস্ট হয়ে গেল একটা কুকর্মতে ফেঁসে গিয়ে। মনিকাকে ইমপ্রেস করার জন্যে যে পঞ্চাশ কপি বই নিজের নামে ছাপিয়েছিল এর তার বই থেকে ঝেড়ে, সেই প্রেসের মালিক রন্তু আজ রীতিমত শাসিয়ে গেছে টাকা পেমেন্টের জন্যে। দুপুরে টাকা চাইতে গিয়ে দেখে ছোটোলোকের মেয়েটা আবার ছবি আঁকতে বসেছে। দেখেই ধাঁ করে মাথা গরম হয়ে গেছিল ওর। কতবার বলেছে, বারন করেছে সে, তবুও আবার! এই ছবি আঁকলেই মনে হয় মেয়েটা তাকে বিদ্রূপ করছে। ছবিটা কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল আর মেরে বসেছিল এক ঘুষি।
আফশোষে হাত কামড়াল রনি। ইস। তখন মাথা গরম না করে কোনোরকমে কাজ হাসিল করে নিলে এখন আর এই চিন্তায় থাকতে হত না তাকে। এতটা বোকামি তো কখনো করেনা সে। এখন কি করা যায়? পাড়ায় সবাই ওকে চেনে। সবাই মোটামুটি জেনে গেছে ওর কীর্তিকলাপ। এখন আর কেউই ধার দিতে চায় না ওকে। নানান অজুহাতে এড়িয়ে যায়। সতুদা থাকলে এইসময় কিছু পাওয়া যেত। কিন্তু…
ডিওর ক্যান থেকে স্প্রে করল অকারণ। তারপর মেসেজ করল মনিকাকে, “শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ লাগছে। আজ যেতে পারব না। প্লিজ কিছু মনে কোরোনা সোনা”।

মাথা গরম হয়ে আছে। ট্রেনে আসতে আসতেই সব শুনেছে সে। আরো মাথা গরম হয়েছে দুপুরে মেরেছে জানোয়ারটা, হাত ফুলে আছে এখনো, কিন্তু শাখা ডাক্তার দেখায়নি শুনে। ফোনেই প্রচন্ড রাগারাগি করেছে সে। শাখা কথা দিয়েছে কাল সকালেই ডাক্তার দেখাবে।
আরেকটা কথা বলেছে সম্পাতি। একটা এফআইআর করতে থানাতে। প্রথমে কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না শাখা। কিন্তু এভাবে মার খাওয়া বন্ধ করার যে আর অন্য কোনো রাস্তাই নেই সেটা বুঝিয়ে বলার পরে নিমরাজি হয়েছে, কিন্তু ড্রাফট টা এখন করে দিতে হবে সম্পাতিকে এই শর্তে।
মেসের ঠাকুর চন্দন খাবার দিয়ে গেল। প্লেট টা খুলে দেখল ও, রুটি, বেগুনের তরকারি আর একটা ওমলেট। খাওয়ার ব্যাপারে কোনো খুঁতখুঁতে ভাব নেই সম্পাতির। যা পায় তাই খায়। হাত ধুয়ে বসে পড়ল সে।
এমনিতে জীবনে খুব বাস্তববাদী সে। কখনো আবেগের বশে কোনো কাজ করেনা। যোগ বিয়োগ গুন ভাগের চাকরী করতে করতে তার মধ্যে আসেনা কাশফুলের রোমান্টিকতা। সব আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্কও একেবারে নিখুঁত দেনাপাওনার হিসেবমত। তাহলে শাখার মধ্যে কি এমন খুঁজে পেল সে, যাতে এত কাছাকাছি চলে গেল সে স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে? শাখার ক্ষেত্রেও ঠিক একই প্রশ্ন কাজ করে। স্বভাবগত ভাবেই শাখা খুব রোমান্টিক, ঠিক তার উলটো। সর্বদা একা থাকতে থাকতে নিজের সঙ্গেই কথা বলে মেয়েটা। ছবি আঁকে, কবিতাও লেখে। যদিও দু একটা ওর কবিতা শাখার ফেসবুকের ওয়ালে দেখেছে সম্পাতি, লাইকও করেছে, কিন্তু বোঝেনি কিছুই। আসলে ওসব কবিতা বা ছবি টবি বোঝার মত অত সূক্ষ্ম বোধ নেই তার। তার শুধু শাখাকে ভালো লাগে। সারাক্ষণ শাখাকে ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা, এটাই কি প্রেম? আপনমনেই মুচকি হাসলো সে। খাওয়া শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ল্যাপটপ টা খুলে বসল ও। ওয়ার্ডে লিখতে শুরু করল, “ টু দ্য অফিসার ইন চার্জ, কালিঘাট পোলিশ স্টেশন…”

জীবনে এই প্রথম নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছে। আজকের সকালটার রঙ অন্যদিনের থেকে একেবারেই আলাদা। দেওয়ালে, আশেপাশের আসবাবগুলোতে হাত বোলাচ্ছিল ও। কতদিন! কতদিন হলো এই পুরনো হয়ে যাওয়া জিনিসগুলো, এই দাগ ধরা রঙ চটা দেওয়াল ওর সঙ্গী। প্রায় বারোটা বছর একটানা এদের সঙ্গেই কাটিয়ে দিল সে। নিজেই আশ্চর্য হয় শাখা। একযুগ! এতদিন সে এই অন্ধকূপে কাটিয়েছে!
আজ ঘুম থেকে ঊঠেই ছাদে গেছিল সে। কাল রাতে ভালো ঘুমও হয়নি। হাতের যন্ত্রণা তো ছিলই, আর ছিল দুশ্চিন্তা। কখনো একা বাড়ির বাইরে যায়নি সে। স্টুডেন্ট লাইফেও যখন ইউনিভার্সিটি তে যেত তখন সঙ্গে থাকত বোন। এখানে টুকটাক কোথাও বেরোতে হলে পাড়ার কোনো মেয়েকে ডেকে নেয় সে। অথচ সম্পাতির জেদে সকাল হলেই যেতে হবে থানায়। একটু একটু রাগও হচ্ছিল সম্পাতির ওপরে। একদিন থেকে যেতে পারত না সে? এরকম ভাবে তাকে বাঘের গুহায় ঠেলে দিয়ে উনি কোন চুলোয় বসে বসে পা নাচাচ্ছেন!
ওর খুব প্রিয় টবগুলোর গায়ে, টবে এতদিন যত্ন করে লাগানো ছোট্ট গাছ গুলোর গায়ে আলতো করে ভালোবাসার হাত বুলিয়ে যাচ্ছিল সে। গাছেরা ভালোবাসা বুঝতে পারে। পরিস্কার বোঝে শাখা, সে আদর করলেই গাছেরা তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার হাতের আঙুলে ওরাও আদর করে। আজ ওদের আদর করতে করতে চোখ দিয়ে টপটপ করে কয়েকফোঁটা ঈষদুষ্ণ জল ঝরে পড়ল।
সকালে যখন বাড়ী থেকে বেরোল, রনি তখনো নাক ডাকছে। এই নাকডাকাও আগে একেবারেই সহ্য করতে পারত না সে। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে মানুষকে কত কিছুই সহ্য করতে হয়। এই পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনে সহ্য করা কাকে বলে, তা প্রতিদিনই একটু একটু করে জেনেছে ও। রোজ সকাল হলেই একটা ভয়ংকর আতঙ্ক চেপে ধরত তাকে। কোন দিক থেকে কি বিপদ আসবে তা আঁচ করার মত প্যাঁচালো বুদ্ধিবৃত্তি নেই তার। ছিলনা কোনোদিনই। একবার কথায় কথায় কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলে ফেলেছিল এ বাড়ী ছেড়ে চলে যাবার কথা। শুনেই রেগে আগুন হয়ে বাবা বলেছিলেন, এ বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলে যেন সে গঙ্গায় ডুবে মরে। বাবার ঠুনকো আভিজাত্যের মোহ যে তার চেয়েও দামী এটা বুঝতে পেরে সেদিন থেকেই সে আরো কঠিন হয়ে গেছিল। বুঝে গেছিল সব সহ্য করতে হবে তাকে এভাবেই যতদিন না মৃত্যু এসে তাকে আদর করে নিয়ে যায়। হঠাৎই কোথা থেকে তার এই শপ্ত জীবনে টুপ করে ঝরে পড়ল সম্পাতি।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের চার্জে একটু আগেই পাড়ার সকলের চোখের সামনে রনি কে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেছে পুলিশ। ফাঁকা বাড়ির দরজায় তালা দিল শাখা, চাবিটা ওপাশে ঘুরে অনীকের হাতে দিয়ে এল। সে এখনো ঘুমের দেশেই ছিল। কাল রাতে একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছিল। ঘুমঘুম চোখে কিছু না বুঝেই চাবি হাতে নিয়ে ফের বিছানায় লম্বা হল। বাড়ির এদিকটায় যে এতকিছু ঘটে গেল তার কিছুই জানেনা ও। জানতে পারলে হয়তো বাড়ির প্রেস্টিজ চলে গেল বলে কিছুক্ষণ লাফালাফি করে নিত। এই অপদার্থ পরজীবীদের সম্মানবোধের আড়ম্বর যে কোন ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই বুঝে উঠল না সে এতদিনেও।
বুক ভরে একটা পূর্ণ শ্বাস টানল শাখা। স্যুটকেস টা হাতে তুলে নিল। আর এখানে নয়। জীবনটা এবার অন্যভাবে নতুনকরে শুরু করতে হবে।

লেখা পাঠাতে পারেন
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *