মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি-র একগুচ্ছ অণুগল্প

 অনুগল্প

                                                            ছবিঃ গৌতম মাহাতো
     মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি-র একগুচ্ছ অণুগল্প

 
                  সমানুভূতি

আমার স্কুলের ছাদের ঠিক নিচের ফোকরগুলোতে ভেন্টিলেটর বসানো হয়নি। পায়রাদের কানে কি করে যেন সে খবর পৌঁছে গেল। প্রথমে একটা–দু’টা, পরে দেখি একপাল পায়রা অবাধ যাতায়াত শুরু করে দিয়েছে সেই ফাঁক দিয়ে। আর নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নিল স্কুলঘরের কার্নিসটাকে। শিক্ষা সরঞ্জাম ও বইপত্রে ভরাট কিছু বাক্স আছে কার্নিসটাতে। তারই ফাঁকে ফাঁকে ওই পায়রার দল দিব্যি বাসা বানিয়ে ফেলল। যখন তখন ওড়াওড়ি করে আর বকম বকম করে। আমার কেমন যেন তাড়াতে ইচ্ছে করল না। শুনেছি পায়রা থাকলে নাকি সে ঘরে লক্ষ্মী বসত করে। 
   কিছুদিন পরে দেখি ক’টা মা পায়রা দিব্যি ডিম পেড়েছে। সে ডিমের উপর বসে তা দিচ্ছে। একদিন ডিম ফুটে বাচ্চাও বের হল। মা পায়রারা উড়ে যায় বাইরে, তারপর মুখে করে খাবার এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে ওদের কীর্তিকলাপ দেখি। আমার বেশ মজা লাগে। স্কুলে তো কিছু দস্যি বাচ্চা থাকে। তারা ডিমগুলো পাড়তে যায়, বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলতে চায়। আমি ওদের নিষেধ করি। বলি – না, ওদের মারতে নেই। ব্যথা লাগবে ওদের।   ওদের মা কাঁদবে। 
   ইদানিং পায়রার সংখ্যা আরো বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে জ্বালা। প্রতিদিন স্কুল ঘরটাকে বিশ্রীভাবে নোংরা করে দেয়। শুধু তাই নয় – দেওয়ালে যে সব মনীষীদের বাঁধানো ফটো আছে – তার উপরে বসে এত নোংরা করে দেয় যে আমাকে কয়েকটা ফটোই আবার নতুন করে বাঁধাতে হল। 
   বিদ্যালয়ের দিদিমণি আর অন্য মাস্টারমশাইরা বারবার অভিযোগ করেন – স্যার, পায়রাগুলোকে আর রাখা যাবে না। ওদের যাতায়াতের বন্ধ করতে হবে। এভাবে প্রতিদিন বিদ্যালয় নোংরা করলে পরিষ্কার করবে কে? হয় দেওয়ালের ফোকরগুলোতে ভেণ্টিলেটর বসানোর ব্যবস্থা করুন, নয়তো ফোকরগুলো একেবারেই বন্ধ করে দিন। পায়রাদের এই জ্বালাতন আর সহ্য হয় না। 
   শেষমেশ রাজমিস্ত্রি ডেকে ইঁট, বালি আর সিমেন্ট দিয়ে ফোকরগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা করি। মনে মনে খুশি হই। যাক – পায়রাগুলো আর ঘরে ঢোকার পথ পাবে না। বাছাধনরা রীতিমতো জব্দ হবে। 
   পরের দিন স্কুলে গেছি। যে ফোকরগুলো বন্ধ করেছি সেগুলোর দিকে নজর পড়তেই চমকে উঠি। বাইরের দিকের দেওয়ালের ফোকরগুলোতে বিশ্রীরকমের আঁকিবুকি দাগ। সিমেন্ট, ইঁট, বালিকে খুবলে খাওয়ার চেষ্টা করেছে যেন। 
   সামনেই ক’জন ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম – কে এমন করেছে বলতো? তোরা করেছিস?
   কাঁদো কাঁদো গলায় একজন বলল – না মাস্টারমশাই, আমরা কেউ করিনি। পায়রাগুলো এমন করেছে। ঘরে ঢুকতে পারেনি বলে পায়ের নখ আর আর মুখের ঠোঁট দিয়ে এমন করে চিরেছে। 
   
   সেদিনই দুপুরের দিকে দোতলায় অফিসরুমে বসে খাতার কাজ সারছি। একা। দোতলার বারান্দাটা পুরো ফাঁকা। কিছুক্ষণ পরেই বকম বকম ডাক শুনে দরজার দিকে তাকাই। দেখি একটা পায়রা আমার সামনে, একেবারে দরজার খুব কাছে এসে পড়েছে। ঘাড় নাড়িয়ে, চোখ টারিয়ে আমাকে যেন বলতে চাইছে – তুমি আমাদের বাসস্থান থেকে এভাবে উচ্ছেদ করলে কেন?
   বুকটা আমার ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল।
                                ★★★
     
                                 টস

 
   দু’জনেই মরতে এসেছিল। ট্রেনের চাকায় মাথা দিয়ে মরবে – এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। মেয়েটি বলল – ‘আমি আগে মরবো, তুমি আমাকে অনুসরণ করো।’ ছেলেটির চটজলদি জবাব – ‘বারে! তা কী করে হয়? আমার ভালোবাসার মৃত্যুকে তো আমি চোখে দেখতে পারবো না। তাই আমি আগে মরবো।’
   মেয়েটি বলল – ‘জিত, মৃত্যুর আগে এভাবে নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি করে কী লাভ বলো? তার চেয়ে বরং এসো-টস করে ফেলি। যে টসে হারবে সেই আগে মরবে।’ 
   ছেলেটি টসে হারল। 
    
   দুরন্ত গতিতে ট্রেনটা এগিয়ে আসছে। সুপার ফার্স্ট ট্রেন। যেন সাক্ষাত যমদুত। -‘আমি আসছি, তুমিও এসো কিন্তু’ – বলে কালবিলম্ব না করে মেয়েটির গোলাপী ঠোঁটে, নরম-কোমল হাতের তালুতে শেষচুম্বন এঁকে দিয়ে ছেলেটি ট্রেনের তলায় ঝাঁপ দিল। মুহূর্তের মধ্যে একটা জলজ্যান্ত বলিষ্ঠ মানব শরীর রূপান্তরিত হয়ে গেল একতাল রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডে। মেয়েটি ভয় পেল মৃত্যুকে। আর্তচিত্‍কার করে মূর্ছা গেল সে।
   
   জ্ঞান ফিরলে মেয়েটি দেখতে পেল তাকে ঘিরে উত্‍সুক জনতার ভিড়। চেনা-পরিচিত অপরিচিত অনেকজনকেই সে দেখতে পাচ্ছে। সেই ভিড়ের মধ্যে তার জিত নেই। জিতকে সে চিরতরে হারিয়ে ফেলছে। সেই হারানোর গ্লানি তাকে জীবন’ভর  বয়ে বেড়াতে হবে। এখন তার মনে হচ্ছে – টসে সে হারল কেন? কেন হারল সে??
                               ★★★

                              মাতঙ্গিনী
 


    পথচারীরা সবাই জিনিসটাকে মাড়িয়ে যাচ্ছে। জুতো পরে গটগট-মসমস করে পেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। পায়ের চাপে কী জিনিসটা পিষ্ট হচ্ছে সে খেয়াল কারুরই নেই। অন্যদের মতো আমিও পা ফেলতে যাচ্ছিলাম-সহসা থমকে দাঁড়াতে হ’ল। -‘ও বাবা, কী করছো তোমরা সব?’ কাঁপা কাঁপা জড়ানো গলায় আমার উদ্দেশ্যে কেউ যেন কিছু বলছেন। 
   
   পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি এক অশীতিপর বৃদ্ধা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তারপর দ্রুততার সঙ্গে আমার প্রায় পায়ের কাছ থেকে ধুলো-কাদা মাখানো রঙিন কাপড়ের টুকরো একটা তুলে নিলেন। ভিজে একেবারে ন্যাতা-কানি হয়ে গেছে সেটা। নিজের পরিধানের বস্ত্র দিয়ে সেটাকে যত্ন সহকারে মুছতে মুছতে সেই বৃদ্ধা বললেন – ‘বাবা, তোমরা কেউ এটা দেখোনি? এটা যে জাতীয় পতাকা। আমাদের দেশের। এটাকে তোমরা সবাই এভাবে জুতো দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছ! কত মর্যাদা আর সম্মানের জিনিস। একে বুক আগলে রক্ষা করতে হয়’।
   
   বৃদ্ধা মিথ্যে বলেননি। দেখলাম সত্যিই ওটা আমাদের জাতীয় পতাকা। গতকালই দেশের স্বাধীনতা দিবস গেছে। কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান হয়তো এটাকে পতাকা উত্তোলনের কাজে ব্যবহার করেছিল। বিকেলের ঝড়-বৃষ্টিতে উড়ে গিয়ে রাস্তায় এসে পড়েছে। পথচারী আমরা দিব্যি সেটাকে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছি। বিস্ময়ের সঙ্গে আরও দেখি সেই বৃদ্ধা ভূলুণ্ঠিত জাতীয় পতাকাটার গা থেকে ধুলো-কাদা ঝেড়ে মুছে সন্তানস্নেহে বুকে টেনে নিয়েছেন। চোখের কোণদুটো জলে চিক চিক করছে তাঁর। 
   
   দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস – কাহিনি পড়ার সময় বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনীর অনেক কথা জেনেছি। মাতঙ্গিনী হাজরা। আলিনান গ্রামের বাহাত্তর বছরের সেই বৃদ্ধা দেশের জাতীয় পতাকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ইংরেজদের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন। এতদিন পরে নতুন করে আবারো এক মাতঙ্গিনীকে যেন অতি সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করলাম। শ্রদ্ধায়- ভক্তিতে সেই বৃদ্ধার চরণে আপনা থেকেই মাথাটা আমার নত হয়ে এল। 
                                ★★★

                            স্বস্তির নি:শ্বাস

   সবকিছুই ঠিকঠাক। পাত্রপক্ষ কনেপক্ষ দু’পক্ষরেই বাড়ি রাজি। রাজদীপ আর সুতপার বিয়েটা শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। এমনসময় রাজদীপের বন্ধু সুকান্ত এসে বলল, ‘চল, তোদের রক্তপরীক্ষাটা করিয়ে নিই’। পরীক্ষায় ধরা পড়ল দু’জনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। সাময়িক মনখারাপ হলেও দু’পক্ষই স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল। ভাগ্যিস, মাঝখানে রক্তপরীক্ষাটা করা হল। আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেল দু’টো জীবন।
                              ★★★

                          বেঁচে ফেরা

 অশান্তি আর ভালো লাগছিল না। পরেশ মনস্থির করল আত্মহত্যা করবে। রেললাইনের সামনে একটা চার্চ। রঙ-বেরঙের ফুলে-বেলুনে-আলোয় ঝলমল করছে পুরো চত্বর। কেউ যেন আসছে তারই পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। পরেশ কি ভেবে চার্চের ভিতরে ঢুকে পড়ল। আ:, কি প্রশান্তি, আরাম! দেহের-মনের সব ক্লান্তি-মলিনতা নিমেষে উধাও। মরে নয়, বেঁচে ফিরে এল পরেশ। 
                                ★★★

                                 সারল্য

সাত বছরের বিক্রম ঠেলে দিল পাঁচ বছরের বিপ্লবকে। সিমেণ্টের মেঝেতে লেগে বিপ্লবের কপাল গেল ফেটে। অন্য একজন ছাত্র ছুটে গিয়ে হেডমাস্টারমশাইকে খবরটা দিল। বিক্রমকে ডেকে পাঠানোর আগেই বিক্রম হাজির।
-মাস্টারমশাই, আলমারি থেকে মলমটা নেব?
-কেন? কী হয়েছে?
বিপ্লবের কপালে লাগাব। কেটে গেছে। 
কী করে কপালটা কাটল?
আমি ঠেলে দিয়েছিলাম মাস্টারমশাই।
                                ★★★

                                  শিখা

 
   দরজা খুলতেই নীরজা হতভম্ব। নতমুখে দাঁড়িয়ে একমাত্র বৌমা শিখা। কিছু বলার আগেই শিখা নীরজার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদে আকুল হল।
  -‘আমি ফিরে এসেছি মা। ঠুনকো আভিজাত্যের সব দম্ভ-অহঙ্কার-দেমাক ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। বেশ বুঝতে পারছি কৃত্রিম নিয়ন আলোর ঝলকানির থেকে তুলসীমঞ্চের প্রদীপশিখা অনেক বেশি স্নিগ্ধ, উজ্জ্বল।’
   আনন্দে নীরজার চোখে জল।

                                 রাধা

 -‘একবার চুল বেঁধে, একবার চুল খুলে বসতে বলেছেন-বসেছি। একবার শাড়ি পরে, একবার ফ্রক পরে হাঁটতে বলেছেন-হেঁটেছি। আপনাদের তৃতীয় দাবি তো মানতে পারছি না। আমার গরিব বাবার পণ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমি এ বিয়ে করবো না’। পাত্রপক্ষের সামনেই গর্জে উঠল রাধা। সাধারণ মেয়ে নয়, যেন এক আগুনের ফুলকিকে প্রত্যক্ষ করল সকলে।

                              ★★★

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *