মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি-র দুটি গল্প

 মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি-র গল্পগাথা

                                                           ছবিঃ গৌতম মাহাতো

               দীনু ও তার বাবা

বহু চিকিত্‍সা সত্ত্বেও দীনুর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেল না। সেই যে একটা খাটো পা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল তা রয়েই গেল। যারফলে সে ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। জোর করে হাঁটতে গেলে সে পড়ে যায়। উঠতে তখন খুব কষ্ট হয়। প্রথম প্রথম একমাত্র ছেলে দীনুর এই অবস্থা দেখে দীনুর বাবা গৌরীবাবুর মন খারাপ হলেও তা তিনি এই অবস্থা অচিরেই কাটিয়ে তুললেন। মনটাকে খুব শক্ত করে ফেললেন তিনি। পৃথিবীতে অনেক সন্তানই তো এসেছে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে। তাদের মধ্যে আবার অনেকেই সেই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সাফল্যের শীর্ষে উন্নীত হয়েছে। সে উদাহরণ ভুরি ভুরি। গৌরীবাবুও তাই প্রতিজ্ঞা করলেন তিনিও তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে পাঁচজনের মধ্যে একজন করে তুলবেন। মা-মরা ছেলেটিকে তিনি কোনরকম বুঝতে দেবেন না সে প্রতিবন্ধী। 
   দীনুর জন্ম দিতে গিয়েই দীনুর মা মারা যায়। হাসপাতালের ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও দীনুর মা’কে বাঁচাতে পারেননি। প্রতিবন্ধী শিশুটিকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন গৌরীবাবু। একে স্ত্রী বিয়োগের ব্যথা, অন্যদিকে শিশুটিও প্রতিবন্ধী। সবে মিলে গৌরীবাবুর তখন খুব খারাপ অবস্থা। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিলেন গৌরীবাবু। হোক তার ছেলে প্রতিবন্ধী। তিনি তাঁকে মানুষের মতো মানুষ কবরেনই এই জেদ তাঁর মাথায় চেপে বসল। অনেকে এসে গৌরীবাবুকে বোঝায় আবার একটা বিয়ে করার জন্য। কিন্তু গৌরীবাবু তাদের সে কথায় কান দিলেন না, সম্মত হলেন না। তিনিই তাদের ঘুরে বোঝালেন-বিয়ে করলে এই প্রতিবন্ধী শিশুটির কী হবে? নতুন স্ত্রী এসে তার এই শিশুটিকে মায়ের যত্ন নিয়ে সেবা-যত্ন করবে এমন নিশ্চয়তা কোথায়? তাই তিনি দ্বিতীয়বার আর বিয়ে করলেন না। দীনুকে বুকের মধ্যে রেখে তাকে মানুষ করার প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হলেন।  
                                    ★★★

              অসমসাহসী মেজদা

    একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল আমার ছোটবেলাকার জীবনে। যে ঘটনাটায় প্রায় নিশ্চিত মৃত্যর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলাম আমি। সে সময় আমাকে বাঁচিয়েছিল আমারই নিজের অকুতোভয়, অসমসাহসী মেজদা। খুব ছোটবেলাকার ঘটনা হলেও স্পষ্ট মনে আছে সেকথা।     
    আমার গ্রামের অবস্থান একটা ব-দ্বীপের মধ্যে। দক্ষিণ দিকে শীলাবতী নদী আর উত্তরদিকে তারই বিধ্বংসী খাল। এ দু’য়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে আমার গ্রামটি। আমার গ্রাম থেকে দু’কিলোমিটারের মতো দূরে পশ্চিমে শীলাবতী নদী দু’টো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ যথেষ্ট চওড়া এবং কিছুটা অগভীর। খানিকটা দক্ষিণমুখো হয়ে বিরাট একটা মোড় নিয়ে সোজা পূর্বদিকে বেরিয়ে গেছে। এটিই আসল শীলাবতী। অন্যটি তার খাল। এটিও সামান্য উত্তরদিকে বাঁক নিয়ে পরে পুবদিকে ঘুরে গেছে। চওড়া কিছুটা কম হলেও গভীরতা অনেক বেশি। সারাবছরই এতে জল থাকে। গ্রামবাসীদের কাছে এটি ‘কেঠেখাল’ নামে পরিচিত। এই খাল সৃষ্টির পিছনে নাকি একটা গল্প আছে। লোকে বলে- অনেকদিন আগে এই খালের অস্তিত্ব বলতে কিছু ছিল না। ছিল একটি নালা। এলাকার মানুষ সেচের জল আনতে এই নালা কেটেছিল। সেই নালাই এখন খালে পরিণত হয়েছে। খাল তো নয়-যেন দ্বিতীয় আর একটি নদী। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না? ‘খাল কেটে কুমির আনা’ এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।    
   সে যাই হোক, বর্ষাকালে এই নদী এবং খাল দু’টিই ভীষণ রূপ ধারণ করে। সে যে কী ভয়ঙ্কর রূপ না দেখলে বোঝা যাবে না। যখন পাড় উপচে ছাপিয়ে যায় বন্যার জল তখন সাঁড়াশির মতো চেপে ধরে এলাকার গ্রামগুলিকে। সেরকমই বর্ষার একদিন। খাল প্রায় জলে ভরা। পলিমেশানো ঘোলাজল বুকে নিয়ে সে ছুটছে। এই অবস্থায় সেদিন সকালবেলায় খালের ওপারে যাব বলে নৌকায় চড়ে বসেছি আমি। ওপারে যাবার কারণ- একটা জমিতে বর্ষাকালীন লঙ্কার চাষ হয়েছে সেই লঙ্কা তুলবো। এবং লঙ্কাখেতে প্রচুর ঘাস হয়েছে সে ঘাস কিছু কেটে নিয়ে আসবো। মা আগের খেয়ায় পার হয়ে গেছেন। ওপারে তীরে দাঁড়িয়ে। 
   নৌকার উপরে আমরা দু’জন। মেজদা আর আমি। মেজদা নৌকার মাথার দিকে দাঁড়িয়ে। হাতে তার বাঁশ। সে-ই নৌকা বাইবে। আমি পিছনের হাল ধরে আছি। হাতে একটা কাস্তে। ঘাস কাটবো তাই কাস্তেটা নেওয়া।
   আমাদের ঘাটের একটা বৈশিষ্ট্য- নৌকা বাইবার জন্য আলাদা করে কোনো মাঝি বা ঘাটোয়াল থাকে না। গ্রামবাসীরা যে যার এল- ওপারে যাবার দরকার কিংবা এপারে আসার প্রয়োজন তো নিজেরাই নৌকা বেয়ে নিয়ে চলে যায়। যার ফলে আমাদের গ্রামে দশ বছরের ছেলে থেকে শুরু করে ষাট বছরের প্রৌঢ় পর্যন্ত প্রায় সকলেই নৌকা বাইতে জানে। একটু বেসামাল হলে স্রোতের টানে হয়তো কিছুটা ভেসে যায়- কিন্তু তারজন্যে ভয় পায় না। যেখানে গিয়ে হোক উঠবে- এই মানসিক জোরটুকু থাকে। যাক, ঘটনাটা বলি- 

      আমার মেজদা নৌকা বাইছে। বয়স আর কত হবে? দশ কী সাড়ে দশ। কিন্তু সাহস প্রচণ্ড। ভয়-ডর বলতে কিছু নেই। সাঁতার শিখে গেছে ভালোমতোই। একশো-দেড়শো মিটার দূরত্বের জল অনায়াসে সাঁতরে পারাপার হতে পারে। সেই সাহসেই নৌকার বাঁশ ধরে ফেলেছে সে খাল ভর্তি জল থাকা সত্বেও। দু’তিনটা বাঁশ 


সবে ফেলেছে হঠাত্‍ মাঝে এসে নৌকার মাথাটা গেল ঘুরে। প্রবল স্রোতের টানে নৌকা পিছু হাঁটতে লাগল। মেজদাও ছাড়বার পাত্র নয়। প্রাণপণে বাঁশের টিপ দিতে লাগল। তা সত্বেও নৌকা বেশ কিছুটা নিচে নেমে গেল। নেমে গেছে মদনদাদুদের বাগানতলা পর্যন্ত। এখানটায় পাড় থেকে নিয়ে খালের বেশ খানিকটা অংশতে প্রচণ্ড একটা ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়েছে। অনেকটা এলাকাজুড়ে জলটা অনবরত পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে। বিরাট একটা পাক খেয়ে নিচের থেকে অনেকটা জল উপর দিয়ে এসে প্রচণ্ড বেগে জোরালো মোচড় নিয়ে কলকল শব্দ করে নিচের দিকে মাঝখান হয়ে দুরন্ত গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওখানেই পাড়ে ছিল মস্ত বড়ো একটা পেয়ারাগাছ- ডালপালা সুদ্ধ সেই মোটা গাছটা আবার জলের মধ্যে পড়ে গেছে। যার ফলে তাতে আছাড় খেয়ে জলটা সশব্দে গর্জন করছে-এক ক্রুদ্ধ অক্রোশে। 
   ওর নিচে নৌকাটা চলে গেলে তুলে আনতে রীতিমতো বেগ পেতে হবে। তাছাড়া পাড় দিয়ে চলার রাস্তা নেই। উপর থেকে গভীর একটা খাদের সৃষ্টি হয়েছে। তাই মেজদা নৌকাটাকে আয়ত্তে আনার কাজে ব্যস্ত। আমি ধরে আছি হালটা। 
   নৌকার হাল যারা কোনোদিন ধরেছে, বিশেষ করে স্রোতসম্পন্ন নদীতে তারা জানে যে নৌকাটা যখন সোজা যেতে যেতে আড়াআড়ি হয়ে যায় অর্থাত্‍ কাত হয়ে ঘুরে তখন হালের উপরে অসম্ভব একটা চাপ পড়ে। সমস্ত জোরটাই তখন হালের উপরে। সেই সময় শক্ত করে ধরে না থাকলে এবং সাবধানে দাঁড়িয়ে না থাকলে হালধরাকারীকে জলের মধ্যে ফেলে দেওয়াটা এমন কিছু আস্বাভাবিক নয়। ঐ ঘূর্ণাবর্তটার কাছে গিয়েই হল সেই ব্যাপারটা। আমার তো তখন অত অভিজ্ঞতা নেই। হাল ধরতে হয় ধরেছি। হালের দিকে মনোযোগ নেই। হাল ধরার থেকেও মেজদা কীভাবে বাঁশ ফেলছে সেটার দিকেই লক্ষ্য বেশি আমার। বলা যেতে পাড়ে আসাবধানে দাঁড়িয়ে। তাছাড়া তখন তো বয়স কম। ছয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলে- শক্তিই বা আর কতটুকু? এই অবস্থায় নৌকাটা বাঁক নিতেই হালটা প্রচণ্ড জোরে ঘুরে গেল। আর ঘুরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আমাকে ফেলে দিল সেই ঘূর্ণায়মান ঘোলা জলে। 
   এই রকম একটা বিপদশঙ্কুল জায়গায় পড়ে আমার যে তখন জলের ভিতরে কী হয়েছিল তা মনে নেই। শুধু একটা দৃশ্য জলের ভিতরে দেখেছিলাম – সর্বত্র কেমন যেন একটা ধোঁয়াটে সাদা ধূসর চাদর বিছিয়ে রেখেছে আমার সামনে। একটা হলদে-সবুজাভ রঙের বিরাট প্রাসাদে পৌঁছে গেছি আমি একা-সম্পূর্ণ একা। আলো নেই, বাতাস নেই; সে প্রাসাদ যেন আমারই জন্যে সৃষ্টি করা এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী। সাঁতার জানি না- বুঝলাম জলের তলায় চলে এসেছি। 
   এই মৃত্যুপুরীর আঙিনায় কতক্ষণ ছিলাম জানি না। কিছু সময় পরে দেখি আমার দুরন্ত সাহসী মেজদা আমাকে জল থেকে সাঁতরে ডাঙায় তুলে এনেছে। মেজদা যে কথাটা আমাকে বলে তা হোল – জলের প্রচণ্ড গর্জনের জন্য আমার পড়ে যাওয়ার শব্দটা শুনতে পায়নি। আমাকে কী একটা নির্দেশ দেবার জন্য যেই পিছন ঘুরেছে তখন দেখে আমি নৌকার মধ্যে নেই। সঙ্গে সঙ্গে ‘ভাই কোথায়, ভাই কোথায়’ বলে চিত্‍কার শুরু করে দিয়েছে। ওদিকে দূরে খালের ওপারে মা দাঁড়িয়ে কাঁদতে লেগে গেছেন – ‘ওরে, তোর ভাই জলে পড়ে গেছে’। 
   মেজদার হাতের বাঁশ তখন হাতেই রয়ে গেছে। ভয় আর আতঙ্ক মেশা অসহায় দৃষ্টি নিয়ে দেখছে আমি কোথায়। 
   প্রথমেই বলেছি জলটা ঘুরছিল। সেই ঘূর্ণায়মান স্রোতই আমাকে ভাসিয়ে দেয়। আর তক্ষুনি মাথার চুলগুলো দেখতে পেয়েই মেজদা দিল ঝাঁপ। মাঝি বিহীন নৌকা ভেসে চলল আপন স্রোতের টানে মাঝ বরাবর, আর বাঁশটাও চলল ভেসে তার পাশাপাশি। মেজদা তখন তার ভাইকে উদ্ধার কার্যে ব্যস্ত। অনেকক্ষন জলের সঙ্গে লড়াই করে তাকে হারিয়ে ভাইকে নিয়ে ডাঙায় উঠে এল আমার অকুতোভয় দাদা। তখন 



মেজদার বয়স মাত্র দশ বছর। জলে ডুবার হাত থেকে বাঁচাতে আমার মেজদা সেদিন কোনো বাধা বিপদই মানে নি। 
   এখন শুনি আমাদের দেশের সমাজ কল্যাণ দপ্তর আঠারো বছরের নীচে কিশোর-কিশোরীদের দু:সাহসিক কাজের জন্যে তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন- এবং এই পুরস্কার দেওয়া হয় প্রতি বছরই। নিজের জীবন বিপন্ন করে কাউকে দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে ঐ কিশোর-কিশোরীদের পুরস্কার দেওয়া হয়। তখনকার আমার মেজদার দু:সাহসিক কর্মকাণ্ডের এই খবরটা যদি উপর মহলে পৌঁছাতে পারত তবে অব্যশই আমার মেজদা পুরস্কার পাওয়ার একজন ভাগীদার হতো। কিন্তু তা আর হয়  নি- হওয়ার কথাও নয়। কারন একেবারে যোগাযোগহীন – বিচ্ছিন্ন এলাকা থেকে এই খবর কোনোদিন পৌঁছাতে পারে না। আর পৌঁছে দেবার মতো লোকও ছিল না সে সময়। যাক সেকথা। 
   ডাঙায় তো উঠে এলাম মেজদার হাত ধরে। আমি তখনো ভয়ে কাঁপছি। সারা শরীর জলে চবচব করছে। মনে পড়ছে বেশ কয়েক ঘোঁট ঘোলাজল খেয়েছিলাম। সে জল মুখ দিয়েও যেমন ঢুকেছিল- তেমনি ঢুকেছিল নাক দিয়েও। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং মজার ব্যাপার হ’ল- ডান হাতে কাস্তেটা যে ধরেছিলাম- সেটা কিন্তু ছাড়িনি। হাতের মুঠোয় শক্ত করেই ধরা ছিল। ডুবন্ত মানুষ যে খড়-কুটোকে ধরেও শেষ বাঁচার চেষ্টা করে আমার হাতে ধরে রাখা কাস্তেটাই ছিল তার জ্বলন্ত প্রমাণ। জলের মধ্যে বাঁচতেই বুঝি প্রাণপণে কাস্তেটা জাপটে ধরেছিলাম সেদিন।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *