অলৌকিক আলোক-ধারার লোকগল্প(৬ষ্ঠ পর্ব)
কলমেঃ সু ক ন্যা দ ত্ত
ছবিঃ সৌ র জি তা হ র চৌ ধু রী
আফ্রিকার পূর্বাংশ থেকে থেকে চলে এলাম পশ্চিম অংশে। সূর্যাস্তের অন্ধকারময় পশ্চিমাংশে
নাইজেরিয়া,ঘানা,নাইজের,চাড,ক্যামারুন,গুয়েনা,
সেনেগাল। বিস্তীর্ণ অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে নীল নদ। নাইজেরিয়া ও ক্যামারুন মধ্যবর্তী ক্যামরুন উচ্চ অংশ, কঙ্গো এবং নাইজের নদীর অতলান্তিক সাগরে মিলন এই অংশ কে সমৃদ্ধ করেছে।
পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে রয়েছে ফুলা, হাউসা, ইরুবা, হিম্বা, ইগবো অশান্টি, আকান, মেবেগা উপজাতি। প্রায় ৩০০০ মাইল জুড়ে সাভানা তৃণভূমি।
পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশ নাইজেরিয়া। দেশেটি শুষ্ক, রুক্ষ্ম বালুকাময় মৃত্তিকা দিয়ে ঘেরা। এই দেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষার প্রভাব দৃশ্যমান। আবহাওয়া আর্দ্র প্রকৃতির। নাইজেরিয়ার পূর্ব পশ্চিম দিকে চাষাবাদের জমি চোখে পড়লে ও দক্ষিণদিকের সামুদ্রিক আবহাওয়ায় ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ, অতিবৃষ্টির অরন্য, মালভূমি অঞ্চল,সাভানা অরণ্য রয়েছে।
দেশটি বৈচিত্র্যময় জীবজন্তুর বাসস্থান। জিরাফ, হায়না, চিতাবাঘ, হাতি, সিংহ,শিম্পাঞ্জি, নানান প্রজাতির বানর নাইজেরিয়ার অরণ্যকে ঘিরে রেখেছে। সাপ,কুমীর, জলহস্তী,উটপাখি, সারস,টিয়া, তুকান পাখির দেখাও মেলে নাইজেরিয়ায়।এই দেশে বহু উপজাতিরা বাস করে।
” আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ,
তাহারই মাঝখানে, আমি পেয়েছি মোর স্থান ,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার প্রাণ।”
কবি, প্রেমিক কিংবা জ্যোর্তি বিজ্ঞানীদের কাছে আকাশের সোনালী সূর্য, রূপোলী সূর্য নানানভাবে ধরা দেয়। মহাকাশের রহস্যময়তা আমাদের ছোটো থেকেই হাতছানি দেয়। মা শিশুকে চাঁদ দেখিয়ে কপালে টিপ দেওয়ার ছড়া শোনায়। কিন্তু এই চাঁদ ও সূর্য আকাশে বাসা বাঁধলো কীভাবে? সে প্রশ্নের উত্তরে রয়েছে দক্ষিণ পূর্বের নাইজেরিয়ায়।
এ বিষয়ে একটি লোকগল্প প্রচলিত আছে।
প্রথম গল্পঃ
সূর্য ও চাঁদ আকাশে থাকে
বহুকাল আগে সূর্য এবং জল দুই বন্ধু ছিলো। তারা একসাথে পৃথিবীতে সকলের সাথে বাস করত। সূর্য জলের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসলে ও জল কখনোই সূর্যের বাড়ী দেখা করতে যেত না। জল বন্ধুর এ হেন আচরণে সূর্য খুব কষ্ট পেতো। একদিন সে জল কে প্রশ্ন করলো,
” বন্ধু, তুমি আমার সাথে দেখা করতে যাও না কেন?”
জল বলল,
” বন্ধু, তোমার বাড়ীটা আমার জন্য খুব ছোটো। আমি যদি আমার সব বন্ধু, আত্মীয়, পরিবার নিয়ে তোমার বাড়ীতে যাই,তাহলে তুমি শুকিয়ে যাবে। তবে আমার বৃহৎ পরিবারের জন্য তুমি যদি একটা বড়ো বাড়ী তৈরি করতে পারো, তাহলে আমি সকলকে নিয়ে তোমার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতে পারি।
সূর্য জলের এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলো। বাড়ী ফিরে সে তার স্ত্রী চাঁদ কে সমস্ত কথা বললো। তারপর দুজনে খুশী হয়েম বাড়ী তৈরির কাজে লেগে পড়লো। সারাদিন, রাত পরিশ্রম করে প্রায় সাতদিন কঠোর পরিশ্রম করার পর বাড়ী তৈরির কাজ শেষ হলে সূর্য জলকে আমন্ত্রণ জানাল। জল সূর্যের বাড়ীর সামনে এসে প্রশ্ন করলো,
” বন্ধু, সূর্য, তোমার বাড়ীটা কি আমার প্রবেশের পক্ষে উপযুক্ত ? “
সূর্য উত্তর দিলো,
” হ্যাঁ বন্ধু,তুমি নির্ভয়ে প্রবেশ করো।”
জল প্রবাহিত হয়ে আসতে লাগলো। তার সাথে তার পরিবারের সকল জলজ প্রাণী, মাছ, ব্যাঙ ধীরে ধীরে সূর্যের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করতে লাগলো। জল ক্রমাগত বাড়তে লাগলো। জলে সূর্য ও চাঁদের পা ডুবে গেলো। কিছুক্ষণ পর জল সূর্য কে জিজ্ঞাসা করলো,
“বন্ধু, আমার আর ও বন্ধু, আত্মীয়, আশ্রিত প্রাণী আছে। তুমি কী চাও, তারা ও বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করুক?”
সূর্য ও চন্দ্র এবারে ও সম্মতি জানালো। এরপর জল সূর্য ও চাঁদের হাঁটুর উপর উঠতে লাগলো।
ঘরের জল আর ও বৃদ্ধি পেতে থাকায় সূর্য ও তার স্ত্রী চাঁদ ঘরের ছাদে আশ্রয় নিলো। জল ছাদ পেড়িয়ে আর ও বাড়তে থাকায় নিরুপায় হয়ে সূর্য এবং চন্দ্র আকাশে চলে গেলো। এরপর থেকে তারা আকাশেই বাস করতে লাগলো।
বিশ্লেষণঃ
নাইজেরিয়ার এই গল্পে ভৌগোলিক বিষয়টি উঠে এসেছে। সূর্য তেজস্বী। তবে আয়তনে ও সংখ্যায় পৃথিবীতে জলাশয়, সমুদ্র, মহাসাগর অনেক বেশী। জলভাগের বিশালতা পরিমাপ করা কঠিন। তাই পৃথিবীর তিনভাগ জল একত্রিত হলে সূর্যের তেজ কে মুছে দিতে পারে। আগুন যতই উত্তপ্ত হোক তাকে নির্বাপিত করার ক্ষমতা একমাত্র জলের আছে। এমনকি প্রকৃতির দাবদাহ কমাতে ধরণীতে বৃষ্টি আবশ্যক। জল ও অগ্নির সহাবস্থান হয় না। এই গল্পে দেখা গেছে, জল সূর্য কে বারংবার প্রশ্ন করেছে, সে ঘরে প্রবেশ করতে পারবে কি না? সূর্য ও চন্দ্র নিজের ধারণ ক্ষমতা না বুঝে সে অনুমতি দিয়েছে। এর ফলে জল সকল কিছু ভাসিয়ে দিয়েছে। জীবনের নৈতিকতার ক্ষেত্রে ও এই গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মন্দ বিচার না করে জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। জলের ঘরে লক্ষ কোটি প্রজাতির প্রানী বাস করে। তাই জল জলীয় প্রাণীর আশ্রয়স্থল। আবার জলের অপর নাম জীবন। প্রাণ রক্ষায় পৃথিবীতে জলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। নাইজেরিয়ার এই গল্পে সূর্য ও চন্দ্রের আকাশ বাসের কাহিনীর আড়ালে সুন্দর যুক্তিগুলো মন কে নাড়া দেয়।
এবার আসি পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা অংশের অশান্টি জনগোষ্ঠীর কথায়। যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে মাকড়সার লোককথা। এই মাকড়সার নাম আনানসি। আকান ভাষায়” আনানসি” র অর্থ মাকড়সা। প্রধানত ঘানায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে থেকে এই গল্পের সূত্রপাত। লোকমুখে প্রচলিত এই লোককথায় আনানসির দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। অশান্টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আনানসির
গল্প প্রচলিত। আনানসি আফ্রিকার ক্রীতদাস প্রথার প্রতিবাদে কৃষ্ণাঙ্গদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে সব প্রকার কঠিন পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করতে পারে। আনানসি মাকড়সা হলেও কখন ও কখন ও লোককথায় তাকে দেবতা হিসেবে ও দেখা যায়। তিনি হলের গল্পের রাজা। আফ্রিকার অধিবাসীদের মতে,তিনি আকাশ থেকে এই পৃথিবীতে গল্প, বুদ্ধি এনেছিলেন।
দ্বিতীয় গল্প
একবার আনানসির মনে হলো, এই পৃথিবীটা বড়ো একঘেয়ে। পৃথিবীবাসীর মধ্যে কোনো গল্প নেই। আকাশের দেবতা নায়মে সমস্ত গল্প বাক্সে ভরে আকাশে রেখে দিয়েছেন। তিনি রেশম সুতোর জাল বুনে আকাশে গিয়ে দেবতা নায়ামের কাছে গল্পের বাক্সটা দেওয়ার পৃথিবীতে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। দেবতা নায়ামে বাক্সটা হাতছাড়া করতে চান না। তাই তিনি আনানসির জন্য কঠিন কিছু কাজ ঠিক করলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তিনি বাক্সটা আনানসি কে দিয়ে দেবেন। নায়ামে আনানসিকে বললেন,
” তোমায় চারটে জিনিস আনতে হবে। অনিনি( বড় চিতাবাঘ), মবরো(মৌমাছি) আর অদৃশ্য মমোতিয়া পরী।
প্রতিটি জীব অসম্ভব বুদ্ধিমান। তাই কার ও পক্ষে তাদের ফাঁদে ফেলা মুশকিল। প্রথমে অনিনিকে বোকা বানিয়ে তাকে গাছের শাখায় বেঁধে রাখলল। তারপর মৌমাছির বাসায় জল ছিটিয়ে কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের ভয় দেখিয়ে তাদের একটা ক্যালাবাসে ভরে নিলো। তারপর আঠার পুতুল তৈরি করে মমোতিয়া কে বন্দী করলো। এরপর সকলকে নিয়ে আনানসি যখন আকাশের দেবতা নায়ামের কাছে গেলো তখন তিনি খুশী হয়ে গল্পের বাক্স আনানসিকে দিয়ে দিলো। অবশেষে আনানসি সেটা নিয়ে পৃথিবীতে চলে এলো।
বিশ্লেষণঃ
কাল্পনিক স্পাইডার ম্যানকে কে না চেনেন? লাল,নীল পোশাকে মোড়া। হাত ঘুরিয়ে জাল তৈরি করে কেমন তড়তড়িয়ে এদিক ওদিক যায়। এতযুগ আগে মাকড়সা মানুষ আনানসি থেকে অনুপ্রাণিত কিনা, তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মাকড়সা হলো বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, নান্দনিকতা, ধৈর্য এবং নিজ ভাগ্য নির্ণায়কের প্রতীক। দ্রুত জাল বুনে সে নিজের প্রতুৎপন্নমতিত্ব এবং পরিশ্রমের পরিচয় দেয়। এই গল্পে আনানসি পৃথিবীর মানুষের জন্য লড়াই করেছে আকাশের সাথে। এই গল্প মানুষের দাবি, অধিকার অর্জনের গল্প।
আজ তবে “আমার কথাটি ফুরোলো/নটে গাছটি মুড়োলো”। পরের পর্বে আফ্রিকার পশ্চিমের পথে আর ও যাত্রা বাকী।
আগের পর্বগুলি পড়তে ক্লিক করুনঃ