জ য় ন্ত কু মা র ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(৫-ম পর্ব) অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা

পরিচিতিঃ জন্ম- ১৯৫২, হুগলী শহর শিক্ষাদীক্ষাঃ স্নাতক- কবি, স্নাতকোত্তর- ববি; গবেষণাপত্রঃ উত্তরবঙ্গ উপ-হিমালয়ের বনবস্তির আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা; প্রাক্তনী- বন্যপ্রাণ শাখা, বনবিভাগ (১৯৭৬-২০১২); জীববৈচিত্র্য-বাস্তুসংস্থান বিষয়ে গ্রন্থকার, জার্নাল-পর্যালোচক; দেশবিদেশে প্রকাশনা ১৪০। মুক্তির সন্ধানে সঙ্গীত চর্চা। বাইফোকালিজম্-র পাতায় আজ তাঁরই ধারাবাহিক গদ্য।

জয়ন্ত কুমার মল্লিক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(৫-ম পর্ব)

অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা

 

পঞ্চম পর্ব

 

আপনারা কি জলচর নেকড়ের নাম শুনেছেন? ল্যাটিন আমেরিকার ওদেরকে বলা হয় ‘রিভার উলফ’বা ‘নদীর নেকড়ে’। সোজা বাংলায় ‘জল-নেকড়ে’ বলাই যায়। এদের বাস চিলি, আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ে বাদে পুরো দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে। আসলে এরা ভোঁদড় গোষ্ঠির বৃহত্তম সদস্য। তাই এদের আসল নাম জায়ান্ট অটার। এরা নেকড়ের ক্ষিপ্রতায় নদী থেকে মাছ, সাপ, কচ্ছপ, এইসব শিকার করে। কিন্তু স্থল নেকড়ে তো জলচর নয় এবং সাধারণত জলপান করা ছাড়া জলের ধারে কাছে খুব একটা ঘেঁসে না। তাই নেকড়েদের সংগে বসবাস করা কমলা ও অমলাকে স্নান করানো খুব কঠিন কাজ ছিল, এবং তাদের এই প্রশিক্ষণ দিতে অনেক সময় লেগেছিল। প্রচণ্ড গরমেও তারা কখনোই চান করতে আগ্রহী হতো না। তবে তারা ভালই জল পান করত, কিন্তু গা ধোয়া একেবারেই পছন্দ করত না।

প্রতীকী ছবিঃ নেকড়ের চান

রাতে সাহস প্রদর্শন
প্রাণীজগতে আমরা দেখতে পাই যে অনেক জীবজন্তু সন্ধ্যার সময় তাদের আশ্রয় ছেড়ে শিকারে বা খাদ্যের সন্ধানে সারা রাত ঘুরে বেড়ায়। সাধারণতঃ এই অভ্যাস মানবজাতির সাথে মোটেই খাপ খায় না। নিশাচররা সারা দিন খুব একটা সক্রিয় থাকে না। কিন্তু যত রাত ঘনিয়ে আসে, তারা তত সক্রিয় হয়ে ওঠে। আবার রাত শেষে তারা ডেরায় ফিরে এসে বিশ্রাম নেয়। এইটাই তাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন। রাতের বেলায় আমরা যখন ঘুমিয়ে পড়ি তখন পৃথিবীর সব প্রাণী ঘুমিয়ে পড়ে না, রাতের প্রাণী জগৎ জেগে থাকে যেমন, নেকড়েরা ঘাসবন, ঝোপ বা গহবরে বাস করে এবং তারা সাধারণতঃ নিশাচর শিকারি, তাই তারা রাতের বেলা বেশি সক্রিয় থাকে। ডাক ছেড়ে সঙ্গীদের নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।
কমলা এবং অমলা প্রথমে এই বিষয়ে প্রাণীজগতের নিয়মই অনুসরণ করত, কারণ তাদের বাড়বৃদ্ধি এবং লালন-পালন এই ভাবেই করা হয়েছিল। কমলা, তার শৈশব থেকে আট বছর, এবং অমলা, দেড় বছর কম, পশুর মতোই জীবনযাপন করেছিল। তারা কার্যত আচরণে বা সবকিছুতে পশুই ছিল; তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই সময়টিকে বেছে নিয়েছিল যখন মানবজাতি তাদের কার্যকলাপ বন্ধ রেখে ঘুমোতে যায় এবং অন্ধকারে বাইরে থাকতে ভয় পায়। এইভাবে দিনের চব্বিশ ঘন্টা সাধারণ মানুষ এবং নিশাচর পশুদের মধ্যে সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তা দেখা যায়।
নিশাচর পশুরা দিনের বেলা নিজেদের লুকিয়ে রাখে। তাই তাদের দেখা যায় না, দিনের বেলা তাদের হাঁকডাকও শোনা যায় না। দিন তাদের কাছে ভয়, ভ্রান্তি ও বিপদের সময় কারণ দিনের বেলা তাদের খুঁজে বের করে শিকার করা হয়। কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত তাদের সাহসী ও হিংস্র করে তোলে এবং তাদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য প্রভাবিত করে। আর এভাবেই দিন যেমন মানুষের, তেমনি রাত নিশাচর পশুর। এইভাবে সমগ্র সৃষ্টি মানবজাতি এবং প্রাণী উভয়ের কাছে সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। প্রাণীর দৃষ্টিশক্তিও সেই অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। রাতে মানুষ সাহসী হয় না এবং দৃষ্টিশক্তিও সীমাবদ্ধ হয়, যখন নিশাচর প্রাণীরা রাতে ভাল দেখতে পায় এবং সাহস দেখায় কারণ নিশাচর প্রাণীরা প্রকৃতিগতভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইন্দ্রিয়শক্তির অধিকারী হয়ে থাকে- শ্রবণশক্তি, ঘ্রাণশক্তিসহ দৃষ্টিশক্তি – এ ইন্দ্রিয়গুলোর অন্যতম। স্বতন্ত্র চোখের দৃষ্টির কারণে রাতের আঁধারে শিকার করতে ভালবাসে।
সেই ভাবেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও দিনের বেলা অল্প সময়ের জন্য কমলা এবং অমলা যদি আলাদা থাকত এবং ভয় পেত, তখন তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করত বা একসাথে থাকতো। কিন্তু যখন তারা একে অপরের থেকে দূরে থাকত এবং ভয় পেলে একত্রিত হতে পারত না, তখন তারা আলাদাভাবেই লুকিয়ে থাকত। অবশ্য রাতে তারা সর্বদা একসাথেই থাকত এবং আলাদা হতে চাইত না।
অবশ্য রাতে তাদের কোনো ভয় ছিল না। তারা জানত যে সবাই ঘুমিয়ে আছে এবং বাইরে আসবে না। তাই তারা নিজেদেরকে সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত মনে করত এবং নির্দ্বিধায় ও সাহসিকতার সাথে উঠানের ভেতরে ঘুরে বেড়াত।

২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯২১
এই দিন তারা যখন রাতে বের হয়েছিল, দেখা গেল যে তাদের কোন ভয়ডর নেই। এতিমখানার উঠোনের চারপাশে খোলা, বিস্তীর্ণ মাঠে তারা প্রফুল্লভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, রাত ১১:০০টা থেকে তারা আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছিল এবং রাত ২:০০টো পর্যন্ত অন্ধকার রাতে নির্ভয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।

ছবিঃ কুকুরের পূর্বপুরুষ ধূসর নেকড়ে

আবেগ২৩শে অক্টোবর, ১৯২০ থেকে সেপ্টেম্বর, ১৯২৩ পর্যন্ত
প্রশ্ন হল তাদের কী কী আবেগ থাকতে পারে? প্রথমতঃ তারা কখনো হাসেনি। কমলার মুখটা হাসিখুশি থাকলেও তাকে আনন্দের আবেগ বলা যায় না। ১৯২০ সালের ২৩শে অক্টোবর থেকে ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস এই তিন বছরে আমি কখনই তাকে প্রকৃত অর্থে হাসতে দেখিনি, খাওয়ার সময় তার চেহারায় আনন্দ বা সন্তুষ্টির বাহ্যিক লক্ষণগুলি দেখা যেত, বিশেষ করে যখন তারা খুব ক্ষুধার্ত থাকত এবং ঘটনাক্রমে পছন্দের মাংস খেতে পেত। তাদের খাওয়া এবং পান করার আনন্দ বা তৃপ্তি ছিল একটি প্রাণীর মতো। তারা খুশি হত যখন তাদের ক্ষুধা মিটত, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। মানুষের খুশি এবং আনন্দের বিপরীতে, তাদের আবেগ খুব সংকীর্ণ একটা জৈবিক বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল, যখন মানবজাতির আনন্দের কারণ অন্যান্য মানসিক তৃপ্তি থেকেও হয়, শুধুমাত্র ক্ষণিক সময়ের দ্বারা আবদ্ধ থাকে না। যখন তারা আমাদের সাথে খোলা মাঠে যেত, তারা যদি আমাদের কাছ থেকে একটি বেশি দূরত্বে চলে যেতে পারত, তাহলে তাদেরকে স্বাধীনভাবে চুপিচুপি চলাফেরা করতে দেখতে পেতাম এবং মাঝে মাঝে তারা নিজেদের মধ্যে খেলত, দৌড়োত, পায়ে এবং হাতে ভর দিয়ে লাফাত, একে অপরের দিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তাকাতো। এই সমস্ত ছিল শুধুমাত্র প্রাণীদের মত একটি অদ্ভুত আনন্দের প্রকাশ।
জানুয়ারী ১৭, ১৯২১
১৯২১ সালের সতেরোই জানুয়ারীতে এই সমস্ত কিছু লক্ষ্য করা যায়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তারা সাধারণ মানব সঙ্গ সম্পূর্ণরূপে ঘৃণা করত।
২১শে সেপ্টেম্বর, ১৯২১
একদিন কমলার অশ্রু ঝরেছিল — দু’চোখ থেকে ফোঁটাফোঁটা জল তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল — কেবলমাত্র সেই সময়ে যখন অমলা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল, দিনটা ছিল বুধবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ১৯২১ সাল
স্নেহ বা সংযুক্তি
ক্ষুধার্ত হলে বা তৃষ্ণা পেলে তারা মিসেস সিংয়ের কাছে যেত, যেমনটা আগে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৮ই মার্চ, ১৯২১
এই দিন তারা এতিমখানার অন্যান্য অল্পবয়স্ক শিশুদের সংগে উঠোনে ছিল, এবং সেই সময় একটি গরু হঠাৎ ছাড়া পেয়ে বাচ্চাদের কাছাকাছি বাগানে দৌড়ে যায়। শিশুরা সবাই তড়িঘড়ি করে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়। কিন্তু কমলা ও অমলা দৌড়ে মিসেস সিং-এর কাছে চলে যায়, কারণ তখন তিনি বাচ্চাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে, দু’জনেই তাঁর সাথে একই ঘরে এসেছিল, যদিও কাছাকাছি নয়, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে, লাজুক ও ভীতু ভঙ্গিতে, সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, চুপিচুপি তাঁর দিকে তাকিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল। এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ পুরো বাড়ির অন্যদের কাছে না গিয়ে শুধু মিসেস সিং-এর কাছে আসা, তাদের নিজস্ব উপায়ে, যতদূর তাদের পশু জীবন তাদের শিখিয়েছে, শুধুমাত্র তাঁর সাথে তাদের ধীরে ধীরে মেলামেশার প্রচেষ্টার ফল। এই প্রচেষ্টা প্রথম ১৯২১ সালের ১১ই জানুয়ারী বোঝা গিছল।
অসুস্থতার সময়, তারা সর্বদা মিসেস সিংকে খুঁজত, যেন তারা তাঁর শুশ্রূষার মধ্যে কিছুটা আরাম পেত। এমন কি তারা তাদের বোতল থেকে দুধ চুষে খেত না, যদি অন্য কোন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত থাকত; যখন তারা কিছুটা শক্তিশালী হয়ে উঠল, তখন তারা মিসেস সিংকে ছাড়া অন্য কাউকে তাদের বোতলে দুধ খাওয়াতে দেয়নি। অন্য কোন ব্যক্তি যখন তাদের দুধ খাওয়াতে যেত তখন তারা অস্থির হয়ে পড়ত, কিন্তু চুপচাপ আমার স্ত্রীকে খাওয়াবার অনুমতি দিত।
নভেম্বর ২৬, ১৯২০
দুধের বোতলগুলো দিতে পারুল নামে এক মেয়েকে সেদিন পাঠানো হয়েছিল। কমলা তার কাছ থেকে বোতল নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অমলা তা খাবার জন্য মুখ না খুলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। মেয়েটি তার ব্যর্থতার কথা জানায়। এর পরে, মিসেস সিং ঘরের ভেতরে গেলেন, তাদের একটু সোহাগ করলেন এবং একের পর এক তাদের গায়ে হাত বোলালেন এবং দু’জনেই বোতল মুখে নিয়ে নিল। কথায় আছে “স্নেহ অতি বিষম বস্তু”, স্নেহর প্রতিদান বড়ই দুর্লভ।
তাদের এইসব ক্রমবর্ধমান অনুভূতির লক্ষণ হল মানুষের, এখানে মিসেস সিং-এর, স্নেহের কাছে বশ্যতা স্বীকার করা। এই পৃথিবীতে স্নেহ বিস্ময়কর কাজ করতে সক্ষম, যদি অবশ্য চেষ্টা করার জন্য ঐশ্বরিক ধৈর্য থাকে অর্থাৎ “সবুরে মেওয়া ফলে” আর কি! স্নেহ বাড়ির পোষা প্রাণী- বিড়াল, কুকুর এবং পাখিদের প্রতিপালন করে। এই স্নেহ উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য কার্যকর, এই স্নেহ আগে এইসব প্রাণীদের কাছে অজানা ছিল। স্নেহ যেন প্রেমের উপহার দেওয়ার মত ধীরে ধীরে এমন একটি পর্যায়ে চলে যায় যে আকৃষ্ট করার এই পদ্ধতি তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে স্নেহশীল মানুষের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, এই হল বিরল স্নেহ। এই স্নেহ একজনকে অন্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে উদ্বুদ্ধ করে, এটি একটি সাহসী মানুষকে একটি কাপুরুষের সাথে, একটি উচ্চমার্গের ব্যক্তিকে একটি নিম্নমার্গের প্রাণীর সাথে, একজন স্বাধীন ব্যক্তিকে একজন ক্রীতদাসের সাথে অর্থাৎ একজন স্নেহশীল মানুষকে এক পশু বা এক শত্রুকেও বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে। মানুষের জীবনের সারমর্ম স্নেহ ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমান ক্ষেত্রে এটি সন্তানোচিত স্নেহ. নেকড়ে-শিশু এবং নেকড়ে-মানব শিশুদের শৈশব থেকেই মা নেকড়ে (তাদের বন্য প্রাণীর প্রকৃতি অনুসারে) একই স্নেহের পরিচয় দিয়েছিল, এমনকি তাদের জন্য প্রাণও বিসর্জন দিতে পিছপা হয় নি। সেই সহানুভূতি বা স্নেহ বা মায়াদয়া, নেকড়ে-মানব শিশুরা আমাদের (মিঃ ও মিসেস সিং-এর) মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু তারা শুরুতে তাদের বিশ্বাস করতে পারেনি এবং তাই মানবিক দক্ষতা গড়ে তুলে তাদের সভ্য হবার অগ্রগতিতে বিলম্ব হয়েছে।
১৯২০ সাল থেকে কমলা এবং অমলা সম্পর্কে আমার গবেষণায় এটি এক মহৎ সত্য হিসাবে আমার কাছে উদ্ঘাটিত হয়েছিল। স্নেহের মাধ্যমেই আমরা তাদের সুপ্ত মানবিক প্রবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে পারি, যেমনটি একটি মানব শিশুর মধ্যে হয়ে থাকে। খুব শৈশবে মায়ের ভালবাসা এবং দয়ামায়া মানবের ভবিষ্যত উন্নতির পথ প্রশস্ত করে। শিশুটি তার মায়ের কাছে অন্ধভাবে বশ্যতা স্বীকার করে কারণ সে জানে যে তার মা তাকে ভালোবাসে এবং সে তাকে বিশ্বাস করতে পারে। সুতরাং, আগে কমলা এবং অমলা আমাদের বিশ্বাস করতে পারেনি, নিশ্চিত হতে পারেনি যে আমরা তাদের প্রতি স্নেহ পোষণ করছি এবং এই সত্যটি বুঝতে এবং বিশ্বাস করতে বিলম্ব হবার ফলে মানব জীবনে তাদের বিকাশ ও অগ্রগতি বিলম্বিত হয়েছিল।
স্নেহ, যেমনটি আমি এতদিন বুঝেছিলাম, বাস্তবে একটি অসম্পূর্ণ ধারণা ছিল এবং আমি এটিকে মানবজাতির মধ্যে সমান বা উচ্চতর এবং নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে দেখেছি। যদিও আমি সৃষ্টির উচ্চ এবং নিম্ন ক্রম, আমাদের নিজস্ব বাড়িতে পোষা প্রাণীর মধ্যে এটির কিছু প্রভাব লক্ষ্য করেছিলাম, তবুও সম্পূর্ণ উপলব্ধি সেখানে ছিল না। এটাকে আরো বড় সত্য, সৃষ্টির লক্ষ্য হিসেবে দেখতে পারিনি। আমাদের মত যাদের বাড়িতে পোষা প্রাণী আছে, তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি? তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবল কি নিজেদের খুশি করার জন্য, তাদের জন্য নয়! আমরা তাদের খাওয়াই কারণ আমরা এটি করার মাধ্যমে নিজেরা কিছু আনন্দ লাভ করি। আমরা তাদের দেখি বা তাদের সাথে কথা বলি বা আদর করি কারণ তাদের মনোভাব, আচরণ এবং গতিবিধি আমাদের খুশি করে। আমাদের পোষা প্রাণীর প্রতি আচরণ যখন কেবল আমাদের নিজেদের আনন্দের জন্য তখন এটা একতরফা এবং স্বার্থপরতার পরিচয়। অন্যদিকে, পোষা প্রাণীরা যখন আমাদের সাথে সম্পর্কিত হয় তখন খুব সহজেই এই ‘সুপারফিশিয়াল’ আচরণকে তারা প্রকৃত স্নেহ হিসাবে গ্রহণ করে না। প্রথমত, তারা আমাদের বিশ্বাস করতে পারে না যে আমরা তাদের বন্ধু হতে পারি। দ্বিতীয়ত, তাদের প্রকৃতি এবং আমাদের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। তাদের পোষ মানাবার জন্য ধৈর্য এবং কৌশলের সাথে প্রেম বা স্নেহের একসাথে সঠিক প্রয়োগ করা প্রয়োজন। অল্পবয়সিদের ক্ষেত্রে এটা সহজ হলেও কিন্তু বড়দের ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সুখ ও দুঃখ অনুভবশক্তির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু সকলের অনুভবশক্তি তো সমান নয়। যেমন স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেনঃ “তোমরা যদি কিছু মনে না কর তবে বলি- অধিকাংশ মানুষ পশু হইতে অতি অল্পই উন্নত। শুধু তাই নয়, অনেক স্থলে ইতর প্রাণী অপেক্ষা তাহাদের সংযম-শক্তি বড় বেশী নয়।” লক্ষ কোটি বছর ধরে প্রাণের রাজ্যে ক্রমাগত পরিবর্তন চলছে। এক-কোষের প্রাণী থেকে ক্রমশ বহু-কোষের প্রাণী হয়েছে। বৈচিত্র্য এসেছে, প্রাণীদের শরীরে নানান জটিলতা এসেছে। নতুন নতুন জীব এসেছে যারা চারপাশের জল-বাতাসের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে টি’কে থাকার জন্যে শরীরে তৈরি করেছে নতুন নতুন অঙ্গ। এইসব জীবদের অনুভবশক্তি অনেক বেশি, বুদ্ধির বহর অনেক বড়! ছোট্ট এক পতঙ্গ। মধুকর। কী তার অনুভবশক্তি! তার আছে ১৭০টি ঘ্রাণ সংবেদী ইন্দ্রিয়; যা শুধু গন্ধই এনে দেয় না দূর থেকে, বরং জানিয়ে দেয় কোন গন্ধ কোন ফুলের! বহুদূর থেকে পায় ফুলের ঘ্রাণ, যেখান থেকে ঘ্রাণ পাওয়ার কোনো উপায় মানুষ এখনো জানে না। মানুষ শুধু মৌমাছিকে অনুসরণ করে মধুর সন্ধান করে।
বন্যদের মতই পোষা প্রাণীরা আমাদের যতটা বুঝতে পারে বলে আমরা মনে করি তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের সূক্ষ্ম অনুভবশক্তি বা স্বজ্ঞা (intuition)। আমাদের বাড়িতেই আমরা তাদের অকৃত্রিমতা শেখাই এবং সেই ভাবেই তাদের গড়ে তুলি এবং পরিণত করতে চেষ্টা করি। জঙ্গলে তারা সহজ, স্বাভাবিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে খুবই হিংস্র, যা তাদের প্রজাতির প্রচলিত ব্যবহারিক ধরন-ধারণ দ্বারা পরিচালিত হয়। জঙ্গলের জানোয়াররা শান্ত হবে এবং আমাদের সঙ্গী হবে এই ইচ্ছা পূরণ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে, কারণ তাদের এবং আমাদের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা এবং আবার, তাদের পশু প্রবৃত্তি বন্য পরিবেশে এমনভাবে বিকশিত হয় যেটা সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারণা নেই। শৈশবকাল থেকেই আপনি সহজেই একটি ছোট প্রাণী বা পাখিকে পোষ মানাতে পারেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্করা ঠিক কেন ওপরে বর্ণিত আচরণ করে, আসলে তা উল্লেখিত পার্থক্যের কারণেই হয়ে থাকে। জড়বাদী দার্শনিকরা মনে করেন যে, মানুষের মনের প্রবৃত্তির কোন কিছুই শরীর থেকে ভিন্ন নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত শারীরবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মন গড়ে উঠে। অন্যদিকে, বন্য প্রাণীদের মধ্যে কোনো মানবিক বিকাশের প্রবৃত্তিই থাকে না। গ্রিক উপকথা অনুযায়ী, দেবতা জিউসের আদেশে প্রমিথিউস পৃথিবীতে পশু ও মানুষ দুইই সৃষ্টি করলেন; কিন্তু অসর্কতার কারণে পশুর সংখ্যা বেড়ে গেলো। দেবতা জিউস তখন প্রমিথিউসকে বললেন, পশুর সংখ্যা বড় বেশি হয়ে গেছে। এদের কিছু সংখ্যাকে তুমি মানুষে পরিণত করো। মহামতি জিউসের কথা মতো প্রমিথিউস কিছু পশুকে মানুষ করে দিলেন। ফলে কিছু পশু মানুষে পরিণত হলো। তবে তাদের চেহারা মানুষের মতো হলেও প্রকৃতি ও আচার-আচরণ পশুর মতোই রয়ে গেলো। সেসব পশু-স্বভাবের মানুষ পৃথিবীতে একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। এখনো কিছু কিছু মানুষের মধ্যে পশু-প্রবৃত্তি প্রবলভাবেই বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলির চাইতে পশু-প্রবৃত্তিই প্রকাশিত হয় বেশি। আমরা আজ পর্যন্ত বন্যপ্রাণীকে আটকে রেখে তাদেরকে পোষ মানানোর যত উদাহরণ দেখেছি, এর মধ্যে প্রায় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় একসময় এই বন্যপ্রাণীরা আর ঘরের লক্ষ্মী পোষা বিড়ালটির মতো না থেকে হিংস্র হয়ে ওঠে ও তার নিজের তথাকথিত ‘মালিকের’ উপরই হামলা করে ফেলে! এখন অনেক প্রশ্ন রয়েই যায়- পোষ্য যদি বন্যই হয়ে থাকবে, তাহলে জন্মের পর তাকে ধরে এনে ঘরের পরিবেশে বড় করার পরও তাদের জাত স্বভাব কেন লোপ পায় না?
যদি লোপ না-ই পেয়ে থাকে, তাহলে কেন কিছু সময় তারা পোষা প্রাণীর মতো আচরণ করে?
কেন অনেক বছর পোষা প্রাণীর মতো আচরণ করার পর হঠাৎ অন্য কারো ওপর হিংস্র হয়ে উঠে আক্রমণ করে?

এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। আসলে কোন বন্য প্রাণীকে গৃহপালিত বা পোষ্য করার প্রক্রিয়াটি হাজার হাজার বছরের পুরনো। আর আমরা যতই ভাবি যে কোনো বন্য প্রাণীকে ‘আমরা’ নিজেরা পোষ মানিয়েছি, আসলে সেটি সেই প্রাণীর পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও তাদের জেনেটিক গঠনের ওপরও অনেকটা নির্ভর করে।

প্রকৃতপক্ষে কোনো বন্য প্রাণীই স্থায়ীভাবে গৃহপালিত নয়। যেমন: বিড়াল আর কুকুরকে আমরা গৃহপালিত বললেও তাদের পূর্বপুরুষেরা সবাই বন্য ছিল। বিড়ালের আগেও কুকুরকে মানুষ তাদের গৃহে জায়গা করে দিয়েছিল। ঠিক কবে থেকে, তার সঠিক হদিস পাওয়া না গেলেও অনেকে মনে করেন, মানুষ তার কৃষিকাজের জন্য কুকুরের ব্যবহার শুরু করেছিল। তবে অন্যদের মতে, কুকুর আরও আগে, যখন মানুষ অন্য বন্য প্রাণী শিকার করে জীবিকা চালাত, তখন থেকেই মানুষের সাথে আছে এবং একটি সহাবস্থানে চলে এসেছে। অন্যদিকে, কুকুরের আদি-পিতা, বন্য ধূসর নেকড়েগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়, কারণ তারা মানুষের সাথে সহাবস্থানে যেতে পারেনি। হলিউডের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সিংহ ও বাঘ প্রশিক্ষণের জন্য বিখ্যাত প্রাণী প্রশিক্ষক পল রেনল্ডস বলেন, “বন্য পশুরা কখনো আপনার বন্ধু হতে পারবে না। আপনাকে তাদেরকে ভুলিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হবে। তারা তখনই আপনার কথা শুনবে, যখন বুঝবে আপনি তাদের উপর হুকুম করার যোগ্য। এভাবেই তাদেরকে সম্মোহিত করতে হবে”।

কিন্তু এখানে আমি একটা দারুণ ব্যতিক্রমী ঘটনার উত্থাপন করতে চাই যেখানে সত্যিই বন্য নেকড়েকে পোষ মানানো হয়েছে। কাজাখস্তানের গ্রামবাসীরা তাদের জমি পাহারা দেওয়ার কাজে বিরল এই প্রাণীকে রক্ষী হিসেবে ব্যবহার করছে এবং এটি গৃহপালিত নয়, বরং বন্যপ্রাণী। সংবাদসূত্রে জানা যাচ্ছে যে দাতারা বলছে, নেকড়ের ব্যবহার ক্রমশ বাড়তে থাকায় এখন একে কিনতেও পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় কে.টি.কে. টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, “আপনি এখন একটি নেকড়ের বাচ্চা কিনতেও পারেন। এজন্যে খরচ পড়বে ৫০০ ডলার। এবং ঠিকমতো চেষ্টা করলে এই বন্যপ্রাণীটিকে খুব সহজে পোষ মানানো যায়।”
দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের একজন নুরসেইত সিলকিশিবে ওই চ্যানেলকে জানিয়েছেন যে তিনি একটি বাচ্চা নেকড়ে কিনেছেন। তিন বছর আগে তিনি একজন শিকারির কাছ থেকে এটা কিনেছিলেন। তার নাম দেওয়া হয়েছে কুর্তকা।
তিনি জানান, নেকড়েটি তার বাড়িতে বেশ ভালো আছে। ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়ির উঠোনে।
তিনি জানান যে নেকড়েটিকে কখনো শেকল দিয়ে বেঁধেও রাখতে হয় না। মাঝেমধ্যেই তাকে গ্রামের ভেতরে হাঁটতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়ির লোকেরা, প্রতিবেশী এবং গ্রামবাসীরাও তাকে দেখে ভয় পায় না।

তিনি বলেন, “আপনি যদি ওকে ঠিকমতো খেতে দেন, যত্ন করেন তাহলে ও আপনাকে আক্রমণ করবে না। যদিও সে কুকুরের চেয়ে বেশিই খায়।”
তবে নেকড়ে বিশেষজ্ঞ আলমাস জাপারফ বলেছেন, এই বন্যপ্রাণীটিকে বাড়িতে রাখা খুবই বিপজ্জনক।
তিনি বলেন, “নেকড়ে হচ্ছে একটি তাজা বোমার মতো। এটা যেকোনো সময়ে যা কিছু করতে পারে।”
এই প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সোশাল মিডিয়াগুলোতে এই নিয়ে আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে নেকড়ে শিকার বন্ধ করতে না পারায় সরকারের সমালোচনাও করছে তারা।
একজন বলছেন, গ্রামের মানুষ এখন তাদের জমির ফসল বাঁচাতে নেকড়ে দিয়ে নেকড়ে ঠেকাচ্ছে। এজন্যেতো আপনি তাদেরকে দোষ দিতে পারেন না। আরেকজন রসিকতা করে বলেছেন, “ভেড়াকে তাদের খোঁয়াড়ে রাখা হয়েছে, ফুলে উঠেছে নেকড়ের পেটও, কিন্তু মেষপালককে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।”
যাই হোক, কমলা ও অমলার ক্ষেত্রে তাদের মানবিক প্রবৃত্তি প্রায় অবচেতনে বা সুপ্ত অবস্থায় ছিল। কাঙ্খিত মেলামেশাকে সম্ভব করে তোলার লক্ষ্যে মানুষ বা প্রাণীর প্রবৃত্তির এই পার্থক্যের মুখোমুখি হওয়া আমাদের পক্ষে খুবই কঠিন সমস্যা ছিল। তবে এই পৃথিবীতে প্রেম ছাড়া কোন সমস্যার সমাধান সহজে হতে পারে না, তা সেটা তার যে কোন রূপেই হোক না কেন।
বাস্তবে মানব শিশু কমলা এবং অমলার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য ছিল যে তাদের পশু প্রবৃত্তির বিকাশের সমস্ত সুযোগ ছিল, অর্থাৎ, বন্য জীবন যাপনের জন্য যা যা প্রয়োজন – এমনকি মানবিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দেহের পরিবর্তনও ঘটেছিল। বন্যজীবন যাপনের প্রয়োজনীয়তার সাথে তারা নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছিল। কমলা ও অমলা এর জলজ্যান্ত প্রমাণ যা অস্বীকার করা যায় না।
এরপর আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রথম জিনিসটি হল তাদের এমন একটি অবস্থানে রাখা যেখানে তারা ধীরে ধীরে আমাদের বুঝতে পারে এবং আমাদের বিশ্বাস করতে পারে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে তাদের জানা উচিত যে তাদের প্রতি আমাদের মনোযোগ প্রকৃত, এবং আমরা তাদের সাথে আমাদের আচরণে আন্তরিক। কমলা নেকড়েদের সাথে আট বছর এবং অমলা দেড় বছর ধরে বাস করছিল। কমলার মধ্যে বন্য জীবনযাপনের বীজ তৈরি এবং অনেক বছর ধরে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিছল। সেসব পরিবর্তন করা এবং সুপ্ত মানব প্রবৃত্তির বিকাশ ঘটানো বা তাকে আমাদের সাথে মেলামেশা করার জন্য খাপ খাওয়ানো খুব কঠিন ছিল।
এই পরিবর্তনের চেষ্টা করার অর্থ হল আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে চাইছি। এই নেকড়ে-মানব শিশুদের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে এই চেষ্টা করা কতটা কঠিন। এটি কেবল তখনই সম্ভব হবে যদি তাদের মধ্যে এমন কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য একটি পছন্দের আবহ তৈরি করতে পারা যাবে। এর অর্থ আমাদের অবশ্যই তাদের বোঝাতে হবে যে আমরা তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং আমরা তাদের আন্তরিকভাবে ভালবাসি। যতক্ষণ না তারা এটি বুঝতে পারে, আমরা তাদের সাথে সম্পর্কিত হতে পারব না এবং তারা আমাদেরকে তাদের উপকারী হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে না। তাদের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম স্নেহ প্রদর্শন করে, আমরা তাদের নিজস্ব উপায়ে এটি উপলব্ধি করাতে চেষ্টা চালাতে লাগলাম। বোঝাপড়া থেকে তাদের ঘৃণাকে বন্ধুত্বে পরিণত করার প্রচেষ্টা। তাদের এই উপলব্ধি বাড়ার সাথে সাথে সম্পর্কের সেই সংযুক্তির প্রগাঢ়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই ভাবনা অবিশ্বাসকে দূর করে, যেটি এতদিন ধরে সমস্ত সূক্ষ্ম অনুভূতির আগত জাগরণকে নষ্ট করতে একটি প্রতিবন্ধকতা হিসাবে প্রতীয়মান ছিল এবং এইভাবে নেকড়ে-মানব শিশুদের মানবিক শিক্ষার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
কমলা এবং অমলার ক্ষেত্রে, তাদের মধ্যে মিসেস সিং-এর সাথে মেলামেশা করার আগ্রহ তৈরি করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে গিয়েছিল (নভেম্বরের চতুর্থ থেকে 21শে সেপ্টেম্বর, 1921)। এটি খুব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র স্নেহ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে, তাই তাদের মধ্যে এই আবেগ খুব চমৎকারভাবে কাজ করেছিল। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের লেখা ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’-তে ক্যাথেরিনা মিনোলা’-র কাহিনী। বাংলা ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। অনুবাদে এর নাম রাখা হয়েছে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’। এই মহিলার স্বভাব কর্কশ, ব্যবহার চণ্ডালী। একে বিয়ে করে পিত্রুশিও। কী করে ধীরে ধীরে সুকৌশলে পিত্রুশিও ঐ বদস্বভাবী, দুর্বিনীত স্ত্রীকে অনুগত, মিষ্টভাষিণী নারীতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয় তাই নিয়ে এই মজার নাটক। প্রাণীজগতেও এই বশীকরণকে আমরা টেমিং বলে জানি, নেকড়ে-মানব শিশুদের এবং আমাদের মধ্যে এক ধরণের বন্ধুত্ব সৃষ্টি যেখানে তারা তাদের পূর্ব জীবনের প্রকৃতির বৈচিত্র্যের কারণে তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া প্রবৃত্তির উত্তরাধিকার ফিরে পাবার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। এই পর্যায়ে তাদের সংগে আমাদের সংঘাত বৃদ্ধি পায় নি। কমলা আর অমলার অতীত ছিল একেবারেই আলাদা। তারা ছিল মানুষের সন্তান, এবং তারা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে মানুষের মধ্যে পাওয়া স্বাভাবিক মানব প্রবৃত্তির পাশাপাশি প্রাণী প্রবৃত্তিরও উত্তরাধিকারী হয়েছিল। তাই তারা প্রাণী প্রবৃত্তি থেকে মানব প্রবৃত্তিতে ফিরে আসতে এত দীর্ঘ সময় নিয়েছে কারণ উভয় ক্ষেত্রেই অবিশ্বাস লুকিয়ে ছিল। যতদিন তারা আন্তরিক, বিশুদ্ধ এবং মুক্ত স্নেহ খুঁজে পায়নি, ততক্ষণ তারা মানবতা প্রবৃত্তি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। যতক্ষণ না তারা জানতে পারে যে মিসেস সিং তাদের বিশ্বস্ত হিতৈষী হয়ে উঠেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তারা একজন মানুষ হওয়ার প্রবৃত্তি দেখায়নি।

ক্রমশঃ

লেখা পাঠাতে পারেন

 

আগের পর্বগুলি পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিংকগুলিতে

জ য় ন্ত কু মা র ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(৪র্থ পর্ব) “অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা”

 

জ য় ন্ত   কু মা র   ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা

 

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *