আফ্রিকার গল্প-৬ঃ অনুবাদ- কামারুজ্জামান

আচেয়া চিনুবের গল্প – (এক)

লেখাঃ  আ কু য়ে কে

অনুবাদঃ কা মা রু জ্জা মা ন

আকুয়েকে দেওয়ালের একপাশে তার অসুখের বিছানায় শুয়ে ছিল। দেওয়ালটা ছিল শত্রুতার দেওয়াল। হঠাৎই তার ও তার ভাইয়েদের শত্রুতাটা গড়ে উঠেছিল। ভয়ে-ভয়ে সে তাদের বিড়বিড় করে বলা কথা শুনছিল। কী করতে হবে তারা তাকে তখনো বলেনি, কিন্তু সে জানত। সে তাদেরকে তাকে এজিতে তাদের মা’য়ের বাবার (মামাদাদু) কাছে নিযে যেতে বলতে চাইল। কিন্তু শত্রুতাটা এমনই ছিল যে তার দেমাক তাকে তা বলতে দিল না। হঠাৎই অদ্ভুতভাবে শত্রুতাটা তাদের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। করে তো তারাই আগে করুক। গতরাতে তাদের সবার বড়ো ওফোদিলে বলতে চেয়েছিল কিন্তু সে শুধু এসে দাঁড়াল এবং তার দিকে চেয়ে রইল, তখন তার চোখ জলে ভরে ছিল। কার জন্যে সে কাঁদছিল? যাক্, গিয়ে সে গু খাক।
পরে যখন আধা-ঘুমের তাড়স এল আকুয়েকের চোখে, সে তখন দূর এজিতে তার মামাদাদুর চত্বরে, তার মনে তখন তার অসুখের স্মৃতিও ছিল না। সে আবার হ’য়ে উঠেছিল সেই গ্রাম্য সুন্দরী।
আকুয়েকে তার মা’য়ের কনিষ্ঠতম সন্তান, একমাত্র কন্যাও বটে। তার ছয় ভাই ছিল। তার বাবা মারা গিয়েছিল যখন সে নেহাতই একটা পুচকে মেয়ে। কিন্তু তার বাবা ছিল বিত্তশালী, তাই তার মৃত্যুতে তার পরিবারকে অভাব বলে কিছু বুঝতে হয়নি। উপরন্তু তার ছেলেদের মধ্যে কেউ-কেউ নিজেদের খামার বানিয়ে তুলেছিল।
বছরে কয়েক বার করে আকুয়েকের মা তার ছেলেপুলেদের এজিতে তার আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যেত। ছোটো বাচ্চাদের পা’য়ের গতিতে চললে উমুওফিয়া থেকে এজিতে পৌঁছুতে গোটা দিন লেগে যেত। কখনো কখনো আকুয়েকে তার মা’য়ের পিঠে চাপত, তারপর আবার কখনো সে হাঁটত। সূর্য্য মাথার ওপর এসে পড়লেই তার মা রাস্তার ধার থেকে একটা ক্যাসাভা গাছের ডাল ভেঙ্গে তা দিয়ে তার মাথা আড়াল করে দিত।
আকুয়েকে তার মা’য়ের বাবার বাড়ি যাওয়ার দিনগুলোর জন্যে মুখিয়ে থাকত। মামাদাদুর বিশাল চেহারা, মাথার চুলগুলো সব সাদা, দাড়িও সব সাদা। কখনো সখনো বুড়ো মানুষটা তার দাড়ি দড়ির মত গুছি করে বাঁধত, তখন ছুঁচালো হ’য়ে ঝুলতে থাকত নিচের দিকটা। যখন সে পামমদ খেত, সেই ছুঁচালো দিক দিয়ে টস টস করে রস ঝরে পড়ত। তা দেখে আকুয়েকের মজার আর শেষ থাকত না। বুড়ো মানুষটা সেটা জানত এবং তাকে আরও মজা দেওয়ার জন্যে প্রতিবার সে ঢক ঢক করে মদ গেলার সময় ইচ্ছে করে তার দাঁতগুলো কিড়মিড় করত।
তার নাতনিও তার খুব প্রিয়। লোকে বলত সে অবিকল তার মা’য়ের মতো দেখতে। সে বলতে গেলে আকুয়েকেকে কখনো তার নাম ধরে ডাকত না; সবসময় সে ছিল তার মা। বস্তুতঃ সে ছিল জীবনের চক্রে ফিরে আসা এক বয়স্কা মহিলা। এজিতে বেড়াতে আসার সময় আকুয়েকে জানত সে যা খুশী করে পার পেয়ে যাবে; তার দাদু কাউকে তাকে বকুনি দিতে বারণ করত।
দেওয়ালের ওপারের কন্ঠস্বর চড়ে উঠল। হয়ত’ পড়োশিরা তার ভাইয়েদের বকুনি দিচ্ছে। সুতরাং ব্যাপারটা সবাই এখন জানে। গুখেকো ওরা গু খাক। যদি সে একবার উঠতে পারত, তবে সে পুরাণো ঝাঁটাটা নিয়ে তাদের খেদিয়ে ভাগিয়ে দিত, ঝাঁটাটা তার বিছানার কাছেই পড়ে আছে। সে ভাবল আজ যদি তার মা বেঁচে থাকত, তার এমন হোত না।
আকুয়েকের মা মারা গিয়েছিল দু’বছর আগে এবং তাকে এজিতে নিয়ে গিয়ে তার জ্ঞাতিদের সঙ্গে কবর দেওয়া হয়েছিল। বুড়ো মানুষটা যে তার জীবনে বহু দুঃখ দেখেছিল সে জিগ্যেস করল, ”ওরা কেন আমায় একলা ফেলে শুধু আমার সন্তানদের নিয়ে চলে যায়?” কিছুদিন পর যারা তাকে সান্ত¡না দিতে এল, তাদের সে বলল, ”আমরা ঈশ্বরের মুরগী। কখনো তার ছানা মুরগী খেতে ইচ্ছে হয়, কখনো ইচ্ছে হয় ধাড়ি মুরগী খেতে।” আকুয়েকের এই দৃশ্যগুলো পরিস্কার মনে পড়ল। একবার সে প্রায় কেঁদেই ফেলল। যখন বুড়ো মানুষটা তার জঘন্য মৃত্যুর কথা শুনবে, তখন সে কী করবে?
আকুয়েকের বয়সের ছেলেরা তার মা’য়ের মৃত্যুর পর শুখা মরশুমে সেই প্রথম প্রকাশ্যে তাদের নাচের মহড়া করল। আকুয়েকের নাচে সর্ব্বত্র একটা হইরই সৃষ্টি হ’ল এবং তার পাণিপ্রার্থীর সংখ্যা দশগুণ বেড়ে উঠল। এক বাজারের দিন থেকে আর এক বাজারের দিনে কিছু লোক তার ভাইয়েদের কাছে পামমদ নিয়ে আসতে লাগল। কিন্তু আকুয়েকে সবাইকে প্রত্যাখান করল। তাতে তার ভাইয়েরা তাকে নিয়ে ভেবে সারা হ’ল। তারা সবাই তাদের একমাত্র বোনকে খুব ভালোবাসে, বিশেষ করে তার মা’য়ের মৃত্যুর পর থেকে। তারা তার সুখের খোঁজে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে লেগে গিয়েছিল।
এখন তারা ভালো বিয়ের সম্পর্ক তাকে হাতছাড়া করে দিতে দেখে আরও ভাবনায় পড়ল। তার বড়ো ভাই ওফোদিলে তাকে যত কড়া করে পারল বলল যে দেমাকি মেয়েরা যারা তার পাণিপ্রার্থীকে পাত্তা দিতে চায় না তাদের কপালে অনেক দুঃখ থাকে, লোকের মুখে শোনা কিস্যার সেই ওনউয়েরোর মত যে প্রতিটা লোককে প্রত্যাখান করেছিল, শেষে তাকে তিনটে মাছের পেছনে ছুটে বেড়াতে হয়েছিল যারা তাকে খেয়ে ফ্যালার জন্যে সুদর্শন যুবকের রূপ ধারণ করেছিল।
আকুয়েকে কোনো কথাই শুনল না। তার জোশ তাকে যেভাবে রক্ষা করে চলেছিল এখন তা-ই তাকে এই ব্যাপারে মদত করতে এগিয়ে এল এবং সে ভীষণ অসুখে আক্রান্ত হ’ল। তার যে পেট ফুলে উঠছিল প্রথম দিকে লোকজন তা লক্ষ্য না করার ভান করে রইল।
তাকে সারিয়ে তোলার জন্যে দূর-দূরান্ত থেকে ওঝাদের ডেকে আনা হ’ল। তাদের গাছ-গাছড়া ও শিকড়-বাকড়ে কোনো কাজ হ’ল না। একজন আফিয়া দৈবজ্ঞ তার ভাইয়েদের এমন একটা পাম গাছের খোঁজে পাঠাল যাতে একটা আঙুর লতা লতিয়ে উঠে তাকে শুষে খেয়েছে। ”যখন তোমরা সেটা দেখতে পাবে,” সে তাদের বলল, ”তখন একটা ম্যাচেট ছুরি দিয়ে গাছের গলা জড়িয়ে ধরা লতাটা কেটে ফেলবে। যে-প্রেতাত্মারা তোমাদের বোনকে বেঁধে রেখেছে, তখন তারা তাকে মুক্তি দেবে।” ভাইয়েরা তিনদিন ধরে উমুওফিয়া ও পড়শি গ্রামে সেই গাছের খোঁজ করতে করতে অবশেষে তেমন একটা পাম গাছের খোঁজ পেল, তার গা থেকে সবকিছু ছাড়িয়ে দিল। কিন্তু তবুও তাদের বোন মুক্ত হ’ল না; বরং তার অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল।
শেষে তারা একসঙ্গে পরামর্শ করতে বসল এবং ভারাক্রান্ত মনে তারা সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছুল যে আকুয়েকেকে শোথ রোগে ধরেছে যা এই দেশের মানুষের কাছে একটা ঘৃণ্য ব্যাপার। আকুয়েকে তার ভাইয়েদের এই পরামর্শের উদ্দেশ্য কী তা জানত। তার বড়ো ভাই তার অসুখের ঘরে পা ফেলতেই সে আর্তনাদ করতে শুরু করল এবং ছুটে পালাল। সারাদিন ধরে এমনই চলতে লাগল। একটা বিপদ অবশ্য ছিল যে সে বাড়িতে মারা গেলে তাতে আনির রোষ গোটা গ্রামের উপর না হলেও গোটা পরিবারের উপর নেমে আসবে। পড়োশিরা আসতে লাগল এবং ভাইয়েদের গুরুতর বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলল যে তারা উমুওফিয়ার ন’টা গ্রামকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সন্ধ্যে হতেই তারা তাকে একটা অশুভ বুনো ঝোপে রেখে দিয়ে এল। তারা তার জন্যে একটা অস্থায়ী আস্তানা ও একটা খরখরে বিছানা বানিয়ে রেখেছিল। ক্লান্তিতে ও তাদের প্রতি ঘৃণায় তখন তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না, সে চুপ করে ছিল। তারা তাকে একা ফেলে রেখে বিদায় নিল।
সে তখনো বেঁচে আছে কি না দেখতে তাদের তিনভাই সকালে আবার সেই বুনো ঝোপে এল। আস্তানাটা খালি পড়ে থাকতে দেখে তারা হতবাক হ’য়ে পড়ল। তারা সারা রাস্তা ছুটতে ছুটতে এসে আর সবাইকে খবর দিল। তারা সবাই আবার সেখানে ফিরে এসে ঝোপের এখানে ওখানে খোঁজ করতে লাগল। কোথাও তাদের বোনের কোনো চিহ্ণ মিলল না। তাহলে নিশ্চয় তাকে বুনো জানোয়ারে খেয়ে ফেলেছে। কখনো সখনো এমন কা-ও ঘটত।
দুই কি তিন চাঁদ অতিক্রান্ত হ’ল। আকুয়েকে সত্যিই মারা গিয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে তাদের দাদু উমুওফিয়ায় দূত পাঠাল। ভাইয়েরা ”হ্যাঁ” বলল এবং দূত এজিতে ফিরে গ্যালো। এক কি দু’সপ্তাহ পর বুড়ো মানুষটা তাদের সব ভাইকে তলব করল। যখন তার নাতিরা এল সে তার ওবিতে (নিজের ঘর) বসে অপেক্ষা করছিল। তাদের সাম্প্রতিক শোকে সমবেদনা প্রকাশের পর সে জিগ্যেস করল তাদের বোন কোথায়। তাদের বড়ো যে সে তাকে আকুয়েকের মৃত্যুর কাহিনী শোনাল। বুড়ো মানুষটা তার ডান হাতের তালুর উপর মাথাটা রেখে মন দিয়ে সবকথা শুনল।
”তাহলে আকুয়েকে মারা গিয়েছে, তাই তো?” সে বলল, আধা জিজ্ঞাসায়, আধা বিবৃতিতে। ”তাহলে তোমরা আমায় খবর পাঠাওনি কেন?” সবাই নিরুত্তর রইল, তখন বড়ো বলল যে তারা সব শুদ্ধিকরণ সেরে নিতে চেয়েছিল। বুড়ো মানুষটা তার দাঁতে দাঁত ঘষল এবং অনেক কষ্টে তিন-চতুর্থাংশ খাড়া হ’য়ে দাঁড়াল, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার শোওয়ার ঘরের দিকে এল, এবং কাঠ কোঁদাই করা দরজাটা ভিতর দিকে ঠেলে ধরল। এবং আকুয়েকের ভূত তাদের সামনে এসে দাঁড়াল, নিরাবেগ ও নিষ্করুণ। সবাই লাফিয়ে উঠল, দু’-একজন আগেই বাইরে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
”এদিকে এসো,” মুখে দুঃখের হাসি নিয়ে বুড়ো মানুষটা বলল। ”তোমরা জানো এই যুবতী কে? আমি জবাব শুনতে চাই। তুমি ওফোদিলে, তুমি-ই সবার বড়ো, আমি তোমার কাছ থেকেই জবাব শুনতে চাই। এটা কে?”
”আমাদের বোন আকুয়েকে।”
”তোমাদের বোন আকুয়েকে? কিন্তু তোমরা তো এইমাত্র বললে সে শোথ রোগে মারা গিয়েছে। সে কী করে মরতে পারে, আবার এখানে আসতে পারে?” কারুর মুখে কোনো কথা নাই। ”তোমরা যদি নাই জানো শোথ রোগ কী, তবে যারা জানে তাদের জিগ্যেস করোনি কেন?”
”আমরা উমুওফিয়া ও আবামের সব ওঝার সঙ্গে পরামর্শ করেছি।”
”তোমরা ওকে আমার এখানে নিয়ে আসোনি কেন?”
তখন বুড়ো মানুষটা অল্প কিছু কথায় বলল যে যেদিন আকুয়েকে তার মেয়ে হতে চলেছিল এবং তখন তার নাম হোত মাতেফি, তা তাদের বলার জন্যে সে তাদের সবাইকে একসঙ্গে ডেকেছিল। সে আর উমুওফিয়ার মেয়ে নয়, সে এজির মেয়ে। তারা তাদের দিকে নীরবে চেয়ে রইল।
”যখন তার বিয়ে হবে,” বুড়ো মানুষটা সবশেষে বলল, ”তার কণে-পণ হবে আমার, তোমাদের নয়। তোমরা তোমাদের শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে পারো, কারণ উমুওফিয়ায় সত্যিই সে মারা গিয়েছে।”
তার ভাইয়েদের সঙ্গে একটাও কোনো কথা না বলে আকুয়েকে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

লেখা পাঠাতে পারেন
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *