জ য় ন্ত    কু মা র    ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(নবম পর্ব) “অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা”

পরিচিতিঃ জন্ম- ১৯৫২, হুগলী শহর শিক্ষাদীক্ষাঃ স্নাতক- কবি, স্নাতকোত্তর- ববি; গবেষণাপত্রঃ উত্তরবঙ্গ উপ-হিমালয়ের বনবস্তির আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা; প্রাক্তনী- বন্যপ্রাণ শাখা, বনবিভাগ (১৯৭৬-২০১২); জীববৈচিত্র্য-বাস্তুসংস্থান বিষয়ে গ্রন্থকার, জার্নাল-পর্যালোচক; দেশবিদেশে প্রকাশনা ১৪০। মুক্তির সন্ধানে সঙ্গীত চর্চা। বাইফোকালিজম্-র পাতায় আজ তাঁরই ধারাবাহিক গদ্য।

জ য় ন্ত    কু মা র    ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(নবম পর্ব)

অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা
নবম পর্ব

 

জঙ্গলে পরিত্যক্ত শিশু কি অবক্ষয়িত সমাজের এক দুরপনেয় ব্যাধির শিকার?
দেশে পরিত্যক্ত নবজাতক শিশু উদ্ধারের ঘটনা অনেক ঘটছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখের সকাল। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কাক ডাকা ভোরে পথচারীরা আবিষ্কার করেন উদ্যানের ভেতরে একটা আইসক্রিমের বড় কাগজের বাক্সের মধ্যে দু’টি নব (একদিন বয়সী) জাতক। খবর পেয়ে শাহবাগ থানা থেকে তাদের মেডিকেল কলেজে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাদের মৃত ঘোষণা করে। এরপর ময়নাতদন্ত হয়। আর থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর দু’টি মামলা হয়। বিভিন্ন সময় কন্যা সন্তান জন্মের কারণে দেশের বহু জায়গায় দেখা গেছে সেই সন্তানকে পরিত্যাগ করা হয়। পৃথিবীর আলো দেখার পর জায়গা হচ্ছে পথের পাশে আবর্জনার স্তুপে। হাসপাতালেও সন্তানকে ফেলে যাবার মত ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ এবং অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ ছাড়াও দরিদ্রদের মধ্যে অপরিকল্পিত সন্তান জন্মের পর শিশুকে পরিত্যক্ত করার ঘটনা ঘটছে। সাময়িকভাবে বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে অমানবিকতার শিকার সেই শিশুদের আশ্রয় মিলছে। শুধু পরিত্যক্ত নয়, হারিয়ে যাওয়া কিংবা পাচারের শিকার হয়ে পরে উদ্ধার করা শিশুদেরও কারো কারো জায়গা হয় সেখানে, কিন্তু এসব শিশুদের স্থায়ী সুরক্ষার কোন দিশা নেই। ২০১৭-১৮ সালের আর্থিক সমীক্ষার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, প্রায় ২১ মিলিয়ন বা ২ কোটি ১০ লাখ মেয়ে ‘আনওয়ান্টেড গার্ল’এর তালিকায় এসেছে। অর্থাৎ এই পরিমাণ কন্যাকে না কোথাও ফেলে দিয়ে বা রেখে দিয়ে আসা হয়েছে। কারণ, সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, এঁদের অবিভাবকরা চাননি যে ঘরে কন্যা সন্তান জন্ম নিক, তাঁদের পছন্দ পুত্র সন্তান। আর তাই বিশাল সংখ্যক কন্যাকে সন্তান হিসাবে ‘চাওয়া হয়নি’-র তালিকায় নথিভুক্ত হতে হয়।

“সূর্যের বীজে- অনূঢ়ার গর্ভে- লজ্জিতা মাতার পরিত্যক্ত সন্তান” (প্রথম পার্থ- বুদ্ধদেব বসু)। এ ধরণের ঘটনা বা দুরাচার ভুরি ভুরি ঘটে আসছে সেই আদ্দিকাল থেকে। শিশুদের, বিশেষ করে কন্যা সন্তান, জঙ্গলে ফেলে দিয়ে যাওয়া মানুষের নিষ্ঠুরতার এক চরমতম উদাহরণ ও সামাজিক ব্যাধি। সাধারণতঃ পরিত্যক্ত নবজাতকের বয়স এক বা দুই দিন হয়ে থাকে। তবে নবজাতক থেকে শুরু করে এক বছরের মধ্যেও অনেক শিশুকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। যারা তাদের নবজাতক সন্তানকে রাস্তায় রেখে চলে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে এমন মানুষ আছেন যারা হয়ত বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে ছিলেন, কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে বিত্তবানও থাকতে পারেন। সমাজে লোকলজ্জার ভয়ে অনৈতিক সম্পর্ক এবং কিশোর-কিশোরীদের, এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের আবেগের ফলে জন্মানো শিশুকে পরিচয় করিয়ে দিতে না পেরে এভাবে সন্তানকে ফেলে দেওয়া হয়। আবার আরেকটা শ্রেণী আছে যারা অর্থনৈতিকভাবে একটা সন্তানের ভরণ-পোষণ নেবার ক্ষমতা নেই। ফলে তারাও সন্তানকে ফেলে রেখে যায়। সমাজে গর্ভপাতকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয় না। পুরুষ তান্ত্রিকতার কারণে পুরুষ দায়িত্ব নেয় না। অনেক সময় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুবকরা সহবাস করায় মেয়েরা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। কিন্তু ওই যুবকরা বিয়ে না করে পালিয়ে যায়। মেয়েরা সন্তানের জন্ম দিলেও লোকলজ্জার ভয়ে শিশুটিকে পরিত্যাগ করে। যে শিশুদের ফেলে দেওয়া হচ্ছে, অনেক সময় তারা মারা যাচ্ছে—এটা গুরুতর অপরাধ। রাতারাতি ‘অনাথ’হয়ে মায়ের এক ফোঁটা দুধ ছাড়াই কাটে একরত্তির জীবন আঁস্তাকুড়ে বা বনেজঙ্গলে? ফলে ফেলে দেওয়া শিশুদের চেহারায় বা আচার আচরণে ‘অস্বাভাবিকত্ব’ দেখা যায়।
গত মাসের কথা। হালিশহর পাঁচমাথা শিবদাসপুর রাস্তার ধার থেকে উদ্ধার সদ্যোজাত জীবিত শিশু কন্যা কর্তব্যরত একজন সিকিউরিটি গার্ড দেখতে পায়। রাস্তার ধারের জঙ্গল থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়ে সামনে গিয়ে সে দেখে একটি সদ্যোজাত শিশু কন্যা বস্তার মধ্যে পোড়া অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছে। ঘটনাস্থলে খবর পেয়ে পৌঁছায় জেঠিয়া থানার পুলিশ বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
চার মাস আগে জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় আর এক সদ্যোজাত শিশু কন্যা। কান্নার আওয়াজ পেয়ে এক মহিলা শিশুটিকে উদ্ধার করেন। চাকুলিয়া থানার কানকি ফাঁড়ির ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের দেহগাঁও এলাকার ঘটনা। জানা গিয়েছে, কানকি দেহগাঁও এলাকার বাসিন্দা সুমতি সরকার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে জঙ্গলে শিশুটির কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। তিনি শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। নবজাতককে কোলে তুলে নিয়ে ওই মহিলা নিজের বাড়ি চলে যান। ঘটনাটি চাউর হতেই ওই মহিলার বাড়িতে ভিড় জমান স্থানীয়রা। পুলিশ খবর পেয়ে ওই মহিলার কাছ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে। পরে কানকি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।
বীরভূমের ইলামবাজার জঙ্গলে পাতা কুড়াতে গিয়ে শিশুর কান্নার আওয়াজ পান স্থানীয় মহিলারা। এরপর শিশুটির কাছে গিয়ে তাঁরা দেখেন, আশপাশে কেউ নেই। স্থানীয় বধূ রীতা বাউড়ির সহায়তায় শিশুটিকে বোলপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে জানতে পারেন, দশদিনের শিশুটির ডান হাত ভাঙা। জেলা সমাজকল্যাণ কেন্দ্র, শিশু কল্যাণকেন্দ্র ও বোলপুর থানায় খবর দেওয়া হয়। চাইল্ড লাইনের আধিকারিকরা রাতেই শিশুটিকে বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। চাইল্ড লাইনের আধিকারিক মাধবরঞ্জন সেনগুপ্ত বলেন, শিশুটিকে উদ্ধারের সময় তার অবস্থা গুরুতর ছিল। বর্তমানে অনেকটাই সুস্থ রয়েছে শিশুটি।
একই পাশবিক ঘটনা ঘটেছিল সাম্প্রতিককালে কুমারডিহি গ্রামের বাগদী পাড়া এলাকায়। এপ্রিল মাসে সদ্যজাত শিশুকন্যাকে জঙ্গলের মধ্যে কাপড়ে পেঁচিয়ে ফেলে দিয়েছিল বাবা-মা। এই অভিযোগে সদ্যজাত সন্তানের বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করেছে পাণ্ডবেশ্বর থানার পুলিশ। জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুটির বর্তমান আশ্রয় চাইল্ড কেয়ার লাইন সংস্থায়।
তিলাবনি কোলিয়ারি সংলগ্ন জিজিসি কলোনি এলাকায় জঙ্গল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় এই সদ্যজাত শিশু কন্যা উদ্ধার হয়। ঝোপের ভেতর থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ কানে আসে স্থানীয়দের। এরপরই তাঁরা ঝোপের ভেতর থেকে একটি থলি থেকে উদ্ধার হয় সদ্যজাত এক কন্যা সন্তান। পরে তাঁরা উদ্ধার হওয়া কন্যা সন্তানটিকে তুলে দেওয়া হয় পাণ্ডবেশ্বর থানার পুলিশের হাতে। এরপরই সদ্যজাত সন্তানটির বাবা মায়ের খোঁজ শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা। খোঁজ শুরু হতেই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে আসে স্থানীয়দের। তাঁরা জানতে পারেন, গ্রামেরি বাসিন্দা পটল বাগদীর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন।

তার শরীরে সন্তানসম্ভবার লক্ষণ না থাকায় তাকে চেপে ধরেন প্রতিবেশীরা। প্রতিবেশীদের নানান প্রশ্নের মুখে পড়ে সব কথা শিকার করে নেন পটল বাগদী ও তার স্ত্রী। চাপে পড়ে তাঁরা জানান, তাদের আগের সন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে দু’টি পুত্র সন্তান ও অন্যটি কন্যা সন্তান। রবিবার ঘরেই ফের আরও একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার আগেই পটল বাগদী থলিতে ভরে শিশুকন্যাটিকে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে আসে বলে স্বীকার করে নেয়। এরপরই সদ্যজাত সন্তানকে জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার অপরাধে পটল বাগদি ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে পান্ডবেশ্বর থানার পুলিশ। নিজেদের অপরাধের কথা ওই দম্পতি স্বীকার করেছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। অর্থাভাব নাকি কন্যা সন্তানের জন্মানোর কারণে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল দম্পতি তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
২০২১ সালের জুন মাসের এক রাতে উত্তর দিনাজপুরের বোচাডাঙ্গা গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয় একটি কয়েক মাসের কন্যা সন্তান। গ্রামের পাশে একটি ঝোপের আড়ালে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। স্থানীয়রা জানান, এক ব্যাক্তি রাতে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় সে ঝোপ থেকে বাচ্চাটির কান্নার আওয়াজ শুনতে পান, এরপর একটু ভয় পেলেও বাকি আর কিছু লোক ডেকে তাঁরা ঝোপ থেকে সেই বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন। দ্রুতই স্থানীয় বাসিন্দা প্রভাস সরকার নামক এক ব্যক্তি এই খবর কালিয়াগঞ্জ থানার পুলিশকে জানান। এরপর প্রভাসবাবু সেই বাচ্চাটিকে চিকিৎসার জন্য কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান এবং সেখান থেকে চাইল্ড লাইনে খবর দেন।
২০২১ সালের জুলাই মাস। বীরভূমের লাভপুরের লাঘাটা ব্রিজের সামনে একটি ঝোপের মধ্যে শিশু কন্যার কান্নার আওয়াজ শুনতে পান স্থানীয় এক মহিলা। এরপর খবর যায় লাভপুর থানায়। লাভপুর থানার পুলিশ গিয়ে সদ্যোজাত শিশুকন্যাটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে লাভপুর হাসপাতালে। সেখান থেকে সিয়ান হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে শিশুকন্যাটিকে চিকিৎসার জন্য। কে বা কারা শিশুকন্যাটিকে ফেলে গেল তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে লাভপুর থানার পুলিশ। শেষপর্যন্ত শিশুটির বাবা-মায়ের খোঁজ মেলে।
এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙেছিল একরত্তির কান্নায়। সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর পরই, বীরভূমের লাভপুরের বাসিন্দা সুকুর মণি থমকে যান কান্নার আওয়াজে। তাঁর দাবি, কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর বুঝতে পারেন কুয়ে নদীর সেতুর পাশে ঝোপের মধ্যে থেকে ভেসে আসছে আওয়াজ। কাছে যেতেই, তিনি দেখেন কাপড় জড়ানো অবস্থায় পড়ে আছে এক সদ্যোজাত শিশুকন্যা। খবর পেয়ে পুলিশ এসে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে। সুকুর মণি মাড্ডি বলেছেন, সকালে ওই এলাকা থেকে যাওয়ার সময় দেখি পড়ে আছে ঝোপের মধ্যে কাপড় জড়িয়ে পড়ে আছে একটি শিশু। পুলিশ সূত্রে খবর, শিশু উদ্ধারের পরই মা-বাবার খোঁজ মেলে। দম্পতির একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। এই সদ্যোজাত তৃতীয় সন্তান। সদ্যোজাতর মায়ের দাবি, বাচ্চাটি জন্মানোর পর নড়াচড়া না করায় ভেবেছিলাম মারা গেছে। তাই ফেলে গেছিলাম। সদ্যোজাতর মা-বাবাকে আটক করেছে পুলিশ। খতিয়ে দেখা হচ্ছে তাঁদের দাবি।
গত বছরে লালগড়ের জঙ্গলের ঘটনা। লালগড়ের জঙ্গল পেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ কানে পৌঁছয় কান্নার আওয়াজ। শুনশান রাস্তায় কান্নার আওয়াজ কোথা থেকে? সাইকেল থেকে নেমে রাজেশ দাস শব্দ অনুসরণ করে জঙ্গলের কাছে গিয়ে দেখেন রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে কাপড় মোড়া এক সদ্যোজাত শিশু। কোনও কাঠুরে বা পাতা কুড়োতে আসা কারওর সন্তান কিনা দেখার জন্য তিনি জঙ্গলে খোঁজ করেন। কাউকে না পেয়ে সদ্যোজাত ওই কন্যাসন্তানকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে আসেন। নিজে নিঃসন্তান রজেশ প্রথমে ভাবেন শিশুটিকে নিজের কাছে রেখে দেবেন। প্রথমিক শুশ্রূষা করার পর নতুন জামা পরিয়ে দেন। তারপর বোঝেন যে পুলিশকে জানাতেই হবে। এর পর লালগড় হাসপাতালে শিশুটিকে এনে পুলিশকে পুরো বিষয়টি জানান। লালগড় হাসপাতালে নার্সদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয় সদ্যোজাত ওই কন্যাসন্তানকে৷ ২০২০ সালের জুন মাসের কথা। বাড়িতে শৌচাগার নেই। তাই জঙ্গলে প্রস্রাব করতে গিয়েছিলেন ২৬ বছর বয়সী এক মহিলা আর তখনই তাঁর প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়। জঙ্গলেই পুত্র সন্তানের জন্ম দেন ওই মহিলা। আর তারপরই জ্ঞান হারান। কয়েক ঘণ্টা পর যখন তাঁর জ্ঞান ফেরে তখন আশেপাশে সন্তান ছিল না। হয়ত শিশুটিকে কোনও বন্য জন্তু গভীর জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে গ্রামবাসীরা। ওই মহিলা বলেছেন, ”আমি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলাম। তখন প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। আর এত রক্ত ক্ষরণ দেখে আমি অজ্ঞান হর যাই। জ্ঞান ফেরার পর আমি আর আমার ছেলেকে খুঁজে পাইনি।” গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, তাঁরা যখন ওই মহিলাকে উদ্ধার করেন তখন তাঁর শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে যে এত বড় বিপত্তি হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি ওই মহিলা।

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে দুর্গাপুরের কাঁকসা থানা এলাকার মলানদীঘির জঙ্গল থেকে রাতে উদ্ধার করা হয় দু’বছরের এক কন্যাশিশুকে। গভীর জঙ্গলে স্থানীয় মহিলারা পাতা কুড়োতে গিয়ে জঙ্গলে সদ‍্যজাত শিশুর কান্নার শব্দ পেয়ে ছুটে গিয়ে একটি সদ‍্যজাত শিশু পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে নিয়ে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দারা কাঁকসা থানার পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে পানাগড় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যায়। শিশুটির সারা গায়ে পিঁপড়ে লেগে ছিল। কে বা কী ভাবে এই জঙ্গলের মধ্যে এই সদ্যোজাত শিশু কন্যাকে ফেলে গেছে তা জানা যায় নি।
এবারে যে ঘটনাটির কথা বলব সেটি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট ব্লকের বোয়ালদার গ্রাম পঞ্চায়েতের দোগাছি এলাকায় এই বছর এপ্রিল মাসে। রাত ৯টায় জঙ্গল থেকে ভেসে আসে এক শিশুর কান্নার আওয়াজ। তা শুনে ঘাবড়ে যান স্থানীয় বাসিন্দারা। কন্যা সন্তানটিকে উদ্ধার করেন এক আদিবাসী দম্পতি এবং সযত্নে নিজেদের কাছে রেখে পরের দিন বালুরঘাট থানা ও চাইল্ড লাইনের হাতে তুলে দেওয়া হয় শিশুটিকে। কন্যা সন্তানের জন্য হয়ত তার বাবা বা মা বা পরিবারের লোকজন সদ্যোজাত শিশুটিকে রাতের অন্ধকারে ফেলে যায় জঙ্গলে। জঙ্গলে শেয়াল বা অন্য কোন মাংসাশী প্রাণী তাকে তুলে নিয়ে যেতে বা খেয়ে ফেলতে পারত, যদিও তা ঘটেনি এক্ষেত্রে। তবে কথায় আছে না ‘রাখে হরি মারে কে?”
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস। তিন বছরের কন্যাসন্তানকে জঙ্গলে রেখে এসেছিলেন বাবা-মা। তিন যুবকের তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে যায় তিন বছরের একরত্তি মেয়েটি। ঝাড়গ্রাম ব্লকের বামুনমারা জঙ্গল থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে মানিকপাড়া থানার পুলিশ। ওই শিশুকন্যার বাবা-মা সহ এক প্রতিবেশীকে আটক করা হয়।
ধৃতদের নাম সুধাংশু ও অন্নপূর্ণা পাত্র। সুধাংশু ডিপ টিউবওয়েল তৈরির কাজ করেন। অন্নপূর্ণা গৃহবধূ। বাড়ি ওডিশার ময়ূরভঞ্জ জেলার ঝাড়পুকুরিয়া থানার দেহাজুড়ি গ্রামে। বুধবার প্রতিবেশী গুরুচরণ বিন্দানির শ্বশুরবাড়ি খড়্গপুর যাবে বলে সকলকে জানায় পাত্র দম্পতি। এর পর মেয়েকে একটি বাইকে চেপে দেহাজুড়ি থেকে রওনা দেন। সঙ্গে ছিল প্রতিবেশী গুরুচরণও। লোধাশুলির জঙ্গল পার হওয়ার পর ৬ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে বামুনমারার শাল জঙ্গলে প্রবেশ করে বাইকটি। বিষয়টি তখন লক্ষ করেন স্থানীয় তিন বন্ধু কৌশিক মাহাতো, পবন মাহাতো, রাজু মাহাতো। কৌশিক, পবনরা বলেন, ‘আমরা দেখলাম বাইক থেকে একজন বয়স্ক লোক নেমে গেল। তারপর দুই পুরুষ-মহিলা সঙ্গে থাকা বাচ্চাকে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকল। প্রায় মিনিট পনের বাদে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল দু’জন। কিন্তু তখন সঙ্গে বাচ্চা নেই। বিষয়টিতে আমাদের সন্দেহ হয়। ওদের পিছনে বাইক নিয়ে ধাওয়া করি। আর মানিকপাড়ার থানার পুলিশকে ফোনে বিষয়টি জানাই।’ যুবকরা বালিভাষা এলাকায় টহলরত পুলিশকে বিষয়টি বললে তাঁরা গাড়ি নিয়ে তাড়া করে গুপ্তমণিতে আটক করে তিন জনকে। প্রথমে পুলিশকে ভুল জঙ্গল দেখায় দম্পতি। ফলে বাচ্চাটিকে দেখতে পায়নি পুলিশ। এরপর ওই যুবকরা এসে আবার জঙ্গলে নিয়ে গেলে বাচ্চাটিকে কোথায় ফেলে রেখে এসেছিল, তা পুলিশকে দেখায় বাবা-মা। তাদের মানিকপাড়ার বিট হাউসে নিয়ে আসা হয়।

তিন বছরের শিশুকন্যাটি জন্ম থেকেই সেরিব্রাল পালসি রোগাক্রান্ত। বাবা সুধাংশু বলে, ‘ছোট থেকেই ভুবনেশ্বর, কটক অনেক জায়গায় ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু ডাক্তাররা বলে দিয়েছে এ কোনওদিন ভালো হবে না। ঘরে বাচ্চাটি শুধু কান্নাকাটি করে। স্ত্রী বলে দিয়েছিল, বাচ্চাটিকে রাখতে পারবে না। ওকে ফেলে দাও। না হলে আমি বিষ খাব। তাই বাধ্য হয়ে বাচ্চাটিকে জঙ্গলে ফেলতে এসেছিলাম।’ অন্নপূর্ণা বলে, ‘দু’মাস আগে বারিপদার আশ্রমেও নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানেও বাচ্চাটিকে রাখেনি। কিছু খাওয়া-দাওয়া করে না। শুধু দিন-রাত কাঁদতে থাকে। মুখ দিয়ে লালা পরে। আর পারছিলাম না। তাই জঙ্গলে ফেলে দিয়ে চলে যাওয়ার কথা বলি স্বামীকে।’ প্রতিবেশী গুরুচরণ বিন্দানি বলে, ‘জঙ্গলে যাওয়ার সময় আমি বারণ করেছিলাম কিন্তু ওরা কথা শোনেনি। আমার শ্বশুরবাড়ি যাবে বলে নিয়ে এসেছিল। রাস্তার মধ্যে কুকর্ম করল। আর আমি ফেঁসে গেলাম।’ এ দিন মানিকপাড়া থানার মধ্যেও শিশুটি কাঁদছিল। থানার মহিলা পুলিশ কনস্টেবল সরস্বতী মাহাতো কোলে তুলে নিতেই বন্ধ হয়ে যায় কান্না। ঝাড়গ্রাম জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের শিশুবিভাগে ভর্তি করা হয় ওই শিশুকন্যাকে। আটক করা হয় তিন জনকে। ঝাড়গ্রাম জেলার পুলিশ সুপার অমিতকুমার ভরত রাঠোর বলেন, ‘শিশুকন্যাটিকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বাকি যা যা করণীয় তাই করা হবে। আর তিন জনের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেব আমরা।’
এই ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। গভীর জঙ্গলে শুকনো পাতার ওপর যেন কিছু হেঁটে যাচ্ছে। এমনই শব্দ শুনে সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন এক দম্পতি। লালগড়ের পডিহা জঙ্গলে কাঠ ও জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। প্রথমে বাঘের উপস্থিতির কথাই মনে হয়েছিল। কিন্তু সাহস সঞ্চয় করে একুট এগিয়ে যান শবর দম্পতি কার্তিক ও সরস্বতী। তারপর তাঁরা যা দেখলেন, তাতে বিস্ময়ের সীমা ছিল না। গভীর জঙ্গলে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে দু’টি শিশু! কথা বলতে গেলে রীতিমতো কান্নাকাটি জুড়ে দেয় তারা। শেষপর্যন্ত ওই শবর দম্পতির চেষ্টায়ই লালগড়ের পডিহার জঙ্গল থেকে ওই দু’টি শিশুকে উদ্ধার করা হয়। শিশুকে দু’টিকে যদি ওই শরব দম্পতি উদ্ধার না করতেন, তাহলে নির্ঘাত বাঘ বা অন্য কোনও বন্যজন্তুর পেটে চলে যেত তারা।
কিন্তু, ওই শিশুটির দুটি পরিচয় কী? তারা গভীর জঙ্গলে এলইবা কী করে?  ওই শিশু দুটি পুলিশকে জানিয়েছে, তাদের নাম সুকুরমণি হাঁসদা ও সংক্রান্তি হাঁসদা। খুব ছোটবেলায় বাবা ছেড়ে চলে গিয়েছে। মাজুগেড়িয়া গ্রামে মায়ের কাছে থাকত সুকুরমণি ও সংক্রান্তি। শনিবার নিজের দুই শিশুসন্তানকে লালগড়ের পডিহার জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে যান মা ফুলমণি হাঁসদা। পশ্চিম মেদিনীপুরের বারিকুল থানার মাজুগেড়িয়ার গ্রামে ফুলমণি হাঁসদার সন্ধানে খোঁজ চালিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, গ্রামবাসীর জানিয়েছেন, গ্রামে ফুলমণি বলে কেউ থাকেন না। শিশুদুটির উচ্চারণ খুব একটা স্পষ্ট নয়। তাই আশেপাশের গ্রামগুলিতে তাঁদের মায়ের খোঁজ করছে পুলিশ। তদন্তকারীরা জানিয়েছে, শিশু দুটির শরীরের অপুষ্টি ছাপ স্পষ্ট। তাই তারা যে গরিব পরিবারের সন্তান, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মা তাদের কেন জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে গেল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল লালগড়ের ঝিটকার জঙ্গলে রুটিন তল্লাশি চালানোর সময়ে শিশুটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করেছিল সিআরপি’র কোবরা বাহিনী। শিশুটির শরীরে সেপ্টিসেমিয়া হয়ে গিয়েছিল। ঝাড়গ্রাম জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধী‌ন থাকার পরে পশ্চিম মেদিনীপুর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির নির্দেশক্রমে শিশুটির ঠাঁই হয় ঝাড়গ্রাম ব্লকের মানিকপাড়ার নিবেদিতা গ্রামীণ কর্মমন্দিরের দত্তক হোমে। হোম কর্তৃপক্ষ শিশুটির নাম দেন পাপিয়া।
এবার বাঁকুড়া জেলার খবর, ২০১৭ সালের ১২ জুলাই ওন্দার মাজডিহা গ্রাম পঞ্চায়েতের আমলাতোড়ার জঙ্গল থেকে ছ’মাসের এক শিশুকন্যাকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটির ডান পায়ে সংক্রমণ ছিল বলে তাকে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতালের কর্মীরা ওই শিশুকন্যাকে দেখে চিনতে পারেন। প্রশাসনিক আধিকারিকদের হাসপাতালের কর্মীরা জানান, কয়েক মাস আগেই ওই শিশুকন্যাকে বাঁকুড়া মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপরে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও বাঁকুড়া চাইল্ড লাইনের উদ্যোগে ওই শিশুকন্যার পরিচয় উদ্ধার করা হয়। ওই শিশুর মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি চাইল্ড লাইনের কাছে দাবি করেন, দ্বিতীয়বার মেয়ে হওয়ায় মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন তিনি। এ ছাড়াও শিশুটি জন্মের থেকেই নানা অসুখে ভুগছে। এই সবের জেরেই কন্যা সন্তানটিকে হাসপাতাল থেকে ছুটি করিয়ে জঙ্গলে ফেলে তার মৃত্যুর মিথ্যা গল্প ফেঁদেছিলেন। সদ্যোজাত শিশু উদ্ধার হয়েছে চা বাগান সংলগ্ন জঙ্গল থেকেও। জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি থানার পদমতী ১ এর অধীন নয়াবাড়ি পাহারপুর এলাকারই এক বাসিন্দা নীতিশ কুমার রায়ের স্ত্রী কবিতা রায় সন্ধ্যায় তাঁর বাড়ির পাশে চা বাগানের মধ্যে শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। কে বা কারা সদ্যজাত এক ছেলে সন্তানকে ফেলে চলে যায়। এরপরই তারা তড়িঘড়ি শিশুটিকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

শুধু আমাদের রাজ্যই নয়, অন্যান্য রাজ্যেও এরকম ঘটনা আকচার ঘটে। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তেলিয়ামুড়া থানাধীন বড়মুড়া খামতিং বাড়ি এলাকায় আসাম আগরতলা জাতীয় সড়কের পাশের গভীর জঙ্গল থেকে এক সদ্যোজাত শিশু কন্যা উদ্ধার করা হয়েছে। কে বা কারা শিশুটিকে জঙ্গলে ফেলে গা ঢাকা দিয়েছিল। শিশুটির তেলিয়ামুড়া হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল। এ এক সামাজিক অবক্ষয়ের নজির। সংবাদে জানা যায়, পরিমল মল্লিক নামে এক যুবক আগরতলা থেকে তেলিয়ামুড়ার দিকে নিজের বাইকে করে আসছিলেন। খামতিং বাড়ি এলাকায় যুবকটির কানে আসে শিশুর কান্নার শব্দ। কোন কিছু বিবেচনা না করে বাইক থামিয়ে কান্নার উৎসস্থলের খোঁজে গভীর জঙ্গল থেকে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তিনি শিশুকন্যাটিকে উদ্ধার করে। পরে খবর দেওয়া হয় তেলিয়ামুড়া থানায়।
তেলিয়ামুড়া থানার পুলিশ খবর পেয়ে এসআই প্রীতম দত্তের নেতৃত্বে ঘটনাস্থল থেকে শিশু কন্যাটিকে উদ্ধার করে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর এস আই প্রীতম দত্ত নিজের কোলে নিয়ে শিশু কন্যাটির কান্না থামানোর জন্য প্রাণভরে চেষ্টা চালিয়ে যায়। যদিও শিশুকন্যাটির কান্না থামাতে হাসপাতালে নার্স কর্মীরা থাকলেও এগিয়ে আসেনি কেউ। বাধ্য হয়ে প্রীতম দত্ত শিশুকন্যাটিকে নিজের কোলে করেই ডাক্তার বাবুসহ নার্সের কাছে নিয়ে যায়। এদিকে শিশুকন্যাটিকে যে উদ্ধার করেছিল সেই যুবক পরিমল মল্লিক পুলিশের সাথে হাসপাতলে আসে এবং শিশুকন্যাটির খোঁজখবর দেয় সেই যুবকটি। তিনি জানান গভীর জঙ্গলে শিশুকন্যাটি চিৎকার করছিল। উদ্ধারের সময় তিনি দেখতে পান শিশুটির সারা শরীরে কাদায় পরিপূর্ণ রয়েছে। জঙ্গলের পোকামাকড় শিশুটিকে কামড়াচ্ছিল। সেখান থেকে তিনি নিজের কোলে করেই জঙ্গল থেকে বের করে জাতীয় সড়কের পাশে নিয়ে আসেন শিশুটিকে। সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে এবং লোকলজ্জার ভয়ে তথাকথিত শহুরে বা গ্রাম্য সমাজের লোকজনরাই এ ধরণের অমানবিক কাজ করে চলেছে।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাস। পুলিশ জঙ্গল থেকে এমন একটি শিশুকে উদ্ধার করেছে যে, তাদের সন্দেহ, শিশুটি বানরদের সাথে বসবাস করতো। উত্তর প্রদেশের এক অরণ্যে মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যায়।

তার বয়স আট থেকে ১০ বছরে মধ্যে হবে বলে অনুমান করা হয়। পুলিশ ঐ এলাকার আশেপাশে নিখোঁজ শিশুদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর করেছে।

ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা করে বলেছেন, মেয়েটি কোন কথা বলে না, শুধু বানরের মতো কিচির-মিচির করে। কয়েক সপ্তাহ আগে নেপালের সীমান্ত সংলগ্ন কাতারনিয়াঘাট সংরক্ষিত অরণ্যে একদল বানরের মধ্যে গ্রামবাসীরা যখন মেয়েটিকে প্রথম দেখতে পায়, তখন সে ছিল পুরোপুরি নগ্ন। সে অপুষ্টিতে ভুগছিল এবং তার দেহে বেশ কয়েক জায়গায় ক্ষত ছিল।

উত্তর প্রদেশ পুলিশের একজন কর্মকর্তা সুরেশ যাদব বলেন, তারা যখন মেয়েটিকে উদ্ধার করতে যায়, তখনও সে একদল বানরের সাথে খেলা করছিল। পুলিশ যখন মেয়েটিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল তখন বানররা তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। মেয়েটির নাম রাখা হয়েছে বন দুর্গা।
চিকিৎসার জন্য তাকে লক্ষৌয়ের মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। অনেকেই মেয়েটিকে রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর অমর চরিত্র মোগলির সাথে তুলনা করছেন। তবে মেয়েটি ঠিক কত দিন ধরে বনে বসবাস করেছে সে সম্পর্কে কোন পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি।

২০১৯ সালের এপ্রিল মাস। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বন থেকে একদিনের এক মেয়ে শিশুকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৪ এপ্রিল) ভোরে উদ্ধারের পর শিশুটিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। লাউয়াছড়া বনের প্রহরী ঋষি বড়ুয়া ও মো: ইব্রাহিম জানান, তারা ভোরে টহলের সময় বনের শ্রীমঙ্গল- ভানুগাছ সড়কের পাশে একটি পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় এক শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান। কাছে গিয়ে সদ্য জন্ম নেয়া এক মেয়ে শিশু দেখতে পান। পরে তারা পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেন।
এই বছর ফেব্রুয়ারী মাসে নেত্রকোনা জেলা শহরের নাগড়া (সওদাগরপাড়া) এলাকা থেকে এক নবজাতক ছেলে শিশুকে একটি জঙ্গলের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটির বয়স মাত্র ১ দিন। রাত সোয়া ১২টার দিকে কয়েক পথচারী নাগড়া (সওদাগরপাড়া) এলাকার একটি জঙ্গলের পাশে নবজাতক শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান। তখন তারা শিশুটিকে দেখে নেত্রকোনা মডেল থানায় খবর দেন। খবর পেয়ে সাড়ে রাত ১২টার দিকে পুলিশ গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে। শিশুটিকে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের শিশু ইউনিটে ভর্তি করা হয়। উল্টোদিকে পশুরাও স্নেহ-মায়ার বশবর্তী হয়ে মানব শিশুদের লালন-পালন করে কমলা-অমলাদের মত এমন ঘটনাও তো অপ্রতুল নয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে এরকম একটি ঘটনার কথা জানা যায়। তবে এটা ঘটেছিল বিদেশে, উত্তর ক্যারোলিনার বরফ ঢাকা জঙ্গলে। কয়েকদিন আগে সেখানে তিন বছরের একটি শিশু হারিয়ে যায়। সেই শিশুর নাম ক্যাসি হাথওয়েকে। টানা দু’দিন ধরে প্রবল ঠান্ডা আর হিংস্র বণ্যপ্রাণীদের সেই জঙ্গলে থেকেও বেঁচে ছিল সেই শিশু। তার বেঁচে থাকার পেছনে অবদান ছিল একটি কালো ভালুকের। কেননা ওই দু’দিন শিশুটিকে সে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিল।

শিশুটি ক্র্যাভেন কাউন্টির জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার পরেই হেলিকপ্টার ও ড্রোন নিয়ে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছিলেন মার্কিন কে-নাইন ইউনিটের উদ্ধারকারীরা। অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন শ’খানেক স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকও। কদিন বাদে গভীর রাতে একটি উদ্ধারকারী দল যখন শিশুটির সন্ধান পায়, তখন তার পাশেই ছিল ভালুকটি।
ক্র্যাভেনের শেরিফ চিপ হুগেসের বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া শিশুটি বলেছে, জঙ্গলের মধ্যেই সে বন্ধুর খোঁজ পেয়েছিল। আর সেই বন্ধু হল একটি কালো ভালুক। হতে পারে এর পুরোটাই ক্যাসির কল্পনা। আবার এমনও হতে পারে, সে যা বলছে তার সবটাই বাস্তব। কিন্তু হিমশীতল, গভীর অরণ্যে দু’রাত কাটানোর পরেও তিন বছরের একটি শিশুকে অক্ষত দেহে উদ্ধারের ঘটনা চমকে দেওয়ার মতোই। তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ধারের পর দুই ফুট দু’ইঞ্চির ছোট্ট ক্যাসি শুধু একটু জল আর তার মাকে দেখতে চাচ্ছিল। আমার তাকে দেখে মোটেও মনে হয়নি যে, সে খুবই আতঙ্কিত। এদিকে তিন বছরের ক্যাসি জানিয়েছে, দু’দিন ধরে ভালুকটি তার সঙ্গে খেলেছে। প্রবল ঠান্ডায় দেহের উষ্ণতা দিয়ে তাকে আঁকড়ে রেখেছে। ক্র্যাভেন কাউন্টির জঙ্গলে কালো ভালুকের ছড়াছড়ি। আগে ওই এলাকায় ভালুকের আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। সেই জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার দু’দিন পরে ক্যাসিকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নিয়ে তার ফুফু ব্রেয়ান্না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘যা ঘটেছে তার সবটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা। ঈশ্বরই তাকে (ভালুক) বন্ধু হিসেবে পাঠিয়েছিলেন ক্যাসির কাছে।’

জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া আর একটি শিশুর কথা বলব যাকে অবশ্য রক্ষা করে এক কুকুর। বাসা থেকে বের হয়ে সেই তিন বছর বয়সী শিশুটি হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় জঙ্গলের ভেতর। বাসা থেকে তার বেরিয়ে যাওয়া কেউ লক্ষ্য না করলেও পোষা কুকুরটি ঠিকই খেয়াল করেছিল। তাই তো শিশুটির পেছন পেছন সে হাঁটতে থাকে। এভাবে ১৬ ঘণ্টা শিশুটিকে দেখে রেখেছিল কুকুরটি। বাড়ির লোকজন আর পুলিশ খোঁজাখুঁজি শুরু করলে কুকুর তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় শিশুটির কাছে।

ঘটনাটি ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে। ১৭ বছর ধরে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে রয়েছে ম্যাক্স নামের কুকুরটি। আরোরা নামে তিন বছর বয়সী শিশুটি সবার অলক্ষ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের ভেতর চলে যায়। তার পেছন পেছন যায় ম্যাক্সও। একসময় রাত নেমে আসে। আরোরাকে পাহারা দিতে সেখানেই রয়ে যায় ম্যাক্স। বুড়ো ম্যাক্স কানে শোনে না। চোখেও স্পষ্ট দেখে না। বাসার লোকজন হন্যে খুঁজতে থাকে আরোরাকে। খবর দেয় পুলিশকে। আরোরার নানি লেইসা ম্যারি বেনেট অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যমকে বলেন, আরোরাকে যেখানে পাওয়া গেছে, তা বাসা থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। সেখানে পৌঁছে তিনি আরোরার কান্না শুনতে পান। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের ওপরে উঠে আসার পর কুকুরটি আমার কাছে ছুটে আসে এবং সোজা আরোরার কাছে নিয়ে যায়।’ নাতনিকে পেয়ে আনন্দে চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি। বললেন, আরোরার খুবই প্রিয় এই কুকুর। তারা দু’জন সারাক্ষণই একসঙ্গে থাকে। এমনকি আরোরা ঘুমায়ও প্রিয় কুকুরটিকে সঙ্গে নিয়ে।

আরোরার স্বজনেরা জানিয়েছেন, একটি পাহাড়ের নিচে আরোরা কুকুরটির সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল। তাপমাত্রা নেমে এসেছিল ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সামান্য কেটে যাওয়া ছাড়া আরোরার আর কোনো ক্ষতি হয়নি। এদিকে শিশুটিকে খুঁজে বের করতে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবার (এসইএস) কর্মী, পুলিশ ও সাধারণ লোকজনসহ শতাধিক মানুষ অভিযানে নামেন।

পুলিশ বুড়ো কুকুর ম্যাক্সের ভূমিকার প্রশংসা করে তাকে ‘পুলিশ কুকুর’ উপাধি দিয়েছে।
পুলিশ পরিদর্শক ক্রেইগ বেরি বলেন, শিশুটির বয়স মাত্র তিন বছর। বোঝাই যাচ্ছে, ওইটুকুন একটি শিশু রাতে একা ভয় পেয়েছে। ঠান্ডায় কষ্ট করেছে। কুকুরটি শিশুটিকে সঙ্গ দিয়েছে, উষ্ণ রেখেছে। এটা অনেক বড় বিষয়। এভাবে সার্বক্ষণিক শিশুটির পাশে কুকুরটির থাকার বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব সিডনির পশু আচরণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল ক্রিভে বিবিসিকে বলেছেন, বয়স্ক কুকুর সাধারণত মানুষের সংস্পর্শের মূল্য দেয়। এই কারণেই সে শিশুটিকে ছেড়ে যায়নি। সে শিশুটির কষ্ট বুঝতে পারছিল।

অধ্যাপক পল আরও বলেন, শিশুটি যদি ওই সময় কেঁদে থাকে, তাহলে কুকুরটি যেকোনো উপায়ে হোক মেয়েটিকে শান্ত করার চেষ্টা করে থাকবে। সারাক্ষণ শিশুটির পাশে থেকে সেই চেষ্টাই করেছে কুকুরটি। ব্রাজিলের আমাজনের জঙ্গলে পাখি ধরতে গিয়ে পাখির পেছনে ছুটতে ছুটতে ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করে আট ও ছয় বছরের দুই আদিবাসী শিশু। দিনশেষে পথ হারিয়ে আটকা পড়ে গভীর অরণ্যে। দীর্ঘ ৪ সপ্তাহ পর তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হারানোর পর থেকে শুধু বৃষ্টির জল ছাড়া কিছুই খায়নি এই দুই ভাই।

গ্লাউকো এবং গ্লাইসন ফেরিরিয়া ছোট্ট পাখি ধরতে গিয়ে আমাজোনাস রাজ্যের ম্যানিকোরের কাছের গহীন জঙ্গলে হারিয়ে যায়। স্থানীয় এক কাঠুরিয়া এই দুই শিশুকে খুঁজে পায়। এই দুই শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর শত শত বাসিন্দা তাদের খুঁজে বের করতে অভিযানে নামে। কিন্তু আমাজনে বর্ষাকাল হওয়ায় সেখানে চলাচল করা খুবই কঠিন ছিল। ফলে তাদের খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সবশেষ আমাজন বনের পালমিরা গ্রাম থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে তাদেরকে খুঁজে পায় এক কাঠুরিয়া। শিশু দুটি জঙ্গলে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে বাস করত। স্থানীয় ব্যক্তি জানায়, গাছ কাটার সময় একটি চিৎকার শুনতে পাই। পরে সেখানে গিয়ে দেখি দুটি শিশু বাঁচার জন্য সাহায্য চাচ্ছে। কাছে গিয়ে লোকটি ছেলে দুটিকে বনের মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে। ক্ষুধায় কাহিল ছিল ওরা। আর খুবই দুর্বল। পরে তাদের উদ্ধার করা হয়। এ সময় তাদের শরীরের বেশকিছু ক্ষতের চিহ্ন দেখা গেছে।
আমাজন জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আগে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিমানচালক অ্যান্তোনিও সেনা ৩৬ দিন পর্যন্ত এই গহীন জঙ্গলে নিখোঁজ ছিলেন। এছাড়া ২০০৮ সালে ১৮ বছরের একজন আধিবাসী তরুণ ৫০ দিনের জন্য আমাজন জঙ্গলে শিকারে গেলে হারিয়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করার কিছুক্ষণ পরই সে মারা যায়।

২০১৬ সালের জুন মাসে একটি ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল খবরের কাগজে যার শিরোনাম ছিল ‘ভালুকের জঙ্গলে জাপানি শিশু’।

“বারবার বারণ করার পরও গাড়ি থেকে পথচারীদের দিকে পাথর ছুড়ছিল শিশুটি। এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন মা-বাবা। শাস্তি দিতে সাত বছরের ছেলেকে পাহাড়ি পথে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন। শিশুটি চলে যায় পাশের জঙ্গলে। সেখানে আবার ভালুকের বসতি। এরপর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তাকে।

এক সপ্তাহ ধরে খোঁজখবর চলে। গতকাল শুক্রবার বহালতবিয়তেই জাপানের উত্তরাঞ্চলের ওই জঙ্গলে পাওয়া যায় ইয়ামাতো তানুকাকে। তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল না। স্বাস্থ্যও ভালো ছিল। সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটির কাছেই হাঁটাহাঁটি করছিল সে। তানুকা জানায়, সেনাঘাঁটির কাছে একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল সে। সেখানে একটি জলের কল ছিল। সেখান থেকে জল পান করত।

জাপানের উত্তরাঞ্চলের হোক্কাইদো দ্বীপের পুলিশের মুখপাত্র তমোহিতো তামুরা বলেন, খবর দেওয়ার পর শিশুটির মা-বাবা এসে দেখা করেছেন। তানুকাকে ফিরে পেয়ে তাঁরা খুবই খুশি।
সেলফ ডিফেন্স ফোর্সের মুখপাত্র মানাবু তাকেহারা এএফপিকে বলেন, তানুকাকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

গত শনিবার যে জায়গা থেকে তানুকা হারিয়ে যায় সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।ছবিঃ হোক্কাইদো দ্বীপে জঙ্গলের ভেতরে জাপানের সেলফ ডিফেন্স ফোর্সের এই ভবনের ভেতরেই পাওয়া যায় শিশুটিকে।
সেলফ ডিফেন্স ফোর্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, জঙ্গলের ভেতরে সেনাবাহিনীর দু’টি ঘর রয়েছে। তার কাছে একটি ঘরে তানুকাকে পাওয়া যায়। দেখামাত্র তানুকা কিছু খেতে চায়। কারণ, সে খুব ক্ষুধার্ত ছিল। নিজের নামও বলে সে।

প্রথমে শিশুটির মা-বাবা পুলিশের কাছে সত্য গোপন করে। বলেন, তারা জঙ্গলের পাশে বুনো সবজি তুলতে নেমেছিলেন। এরপর তানুকা হারিয়ে গেছে। পরে পুলিশকে জানান, শাস্তি দিতে শিশুটিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন।
মা-বাবার এমন নিষ্ঠুর আচরণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ জাপানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে কঠোর সমালোচনা হয়। তানুকার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে জাপানবাসী। তাকে খুঁজে পাওয়ার পর তাই চেনা-অচেনা সবাই আনন্দিত। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তানুকাকে নিয়েই যত আলোচনা।

টুইটারে দেওয়া বার্তায় একজন লেখেন, ‘ওহ, শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে।’ কীভাবে সাত দিন জঙ্গলে একা বেঁচেছিল শিশুটি তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন আরেক টুইটার ব্যবহারকারী।
পুরো এক সপ্তাহ জঙ্গলে তানুকার খোঁজ চলেছে। প্রথমে পুলিশ তাকে খোঁজে। পরে জাপানি সেনারাও যোগ দেয়। ভারী বৃষ্টির জন্য উদ্ধার কাজ ব্যাহত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত যখন তানুকাকে পাওয়া গেল, তখন সবাই দারুণ খুশি। ভুল বুঝতে পেরেছেন তানুকার মা-বাবাও। জাপানের গণমাধ্যমে প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে এ রকম আচরণ করায় সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তানুকার বাবা।

২০২১ সালের অক্টোবর মাসে পরিবারের সঙ্গে চেক সীমান্তের কাছাকাছি পাহাড়ে ভ্রমণে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া আট বছর বয়সী শিশু জুলিয়াকে দু’দিন বাদে খুঁজে পেয়েছে চেক পুলিশ। বিকেলে ভাই ও কাজিনের সঙ্গে খেলতে খেলতে সে হারিয়ে যায়। অন্য দু’টি শিশুকে পাওয়া গেলেও সেদিন জুলিয়াকে পাওয়া যায়নি। হারিয়ে যাওয়ার স্থান থেকে দু-তিন কিলোমিটার দূরেই খুঁজে পাওয়া যায় তাকে। মেয়েটি সজাগ ছিল। তবে সে ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিল এবং ক্লান্ত ছিল। তবে তার কোনো বিপদ ঘটেনি এবং সে অক্ষত ছিল। জার্মান-চেক প্রজাতন্ত্র সীমান্তে এই সার্চ অপরেশনে অংশ নেয় শতাধিক চেক ও জার্মান পুলিশ, সঙ্গে ছিলেন ফরেস্ট রেঞ্জারস। পুলিশ জানায়, তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে জার্মান চিকিৎসকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার অবস্থা স্থিতিশীল। তাকে খাওয়ানো হয়েছে। তারা এ-ও জানায়, রাতে সীমান্তসংলগ্ন বোহেমিয়ান বন এলাকার তাপমাত্রা নেমে আসে ফ্রিজিং পয়েন্টের কাছাকাছি। একটি শিশু দু’দিন না খেয়ে বা জল পান না করে থাকতে পারে। তবে সমস্যা ছিল তাপমাত্রা এবং প্রতিটি ঘণ্টা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জানা গেছে, চেক-জার্মান সীমান্তের চেক অংশের কেসকা কুবিক শহরের কাছাকাছি তার সন্ধান মেলে।

ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় ব্রেশা প্রভিন্সে গত বছর ২০২০ সালের ১৯ জুলাই বাংলাদেশী দম্পতি লিটন ও সোনিয়ার ১২ বছরের কন্যা ইউশরা স্থানীয় বনাঞ্চলে শিক্ষা সফরে গিয়ে হারিয়ে যায়।
নিখোঁজের পর থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর, অত্যাধুনিক ড্রোন, পেশাদার ডুবুরি সেই সাথে বিশ্বের সেরা সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে টানা ৭ মাস চিরুনি অভিযান চালিয়েও উদ্ধার করা যায়নি হতভাগ্য কিশোরী ইউশরাকে। এক পর্যায়ে থেমে যায় উদ্ধার অভিযান। ২৭ মাসের মাথায় ব্রেশা প্রভিন্সের সেরলে পৌর এলাকার একই বনাঞ্চলে একজন শিকারী রোববার একটি মাথার খুলি দেখতে পায়। দ্রুত খবর পেয়ে ছুটে যায় প্যারামিলিটারি পুলিশ ফোর্স ‘ক্যারাবিনিয়েরি’।
দুই বছর আগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনাকারীরা খুলি দেখেই নিশ্চিত হয় এটি ১২ বছর বয়সী কিশোরীর। অফিসিয়ালি নিশ্চিত হতে খুলির ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার মা-বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ক্রমশঃ

 

লেখা পাঠাতে পারেন

আগের পর্ব পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

জ য় ন্ত    কু মা র    ম ল্লি ক-র একটি ধারাবাহিক গদ্য(অষ্টম পর্ব) অথ নেকড়ে-মানব-মানবী কথাঃ গল্প বনাম সত্যি ঘটনা

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *