দুঃখানন্দ মণ্ডল-এর অণুগল্পের ডালি

দুঃখানন্দ মণ্ডল-এর অণুগল্পের ডালি

                                                     

ছবিঃগৌতম মাহাতো

                     মিছিল


পান্তা তাড়াতাড়ি দে, শংকরী।আমার হাতে সময় নেই।ভোটের লাইনে লোক জমা হয়ে যাচ্ছে। হ্ হ্ তুমার তো শুধু ভোট আর ভোট।কইলি আমি সুকল সুকল যাবো।আর তুমি ধমক মেরে বলছো দাঙা হতে পারে।তাহলে তুই যাবি কেন? তোর কথা রাখ।আমাকে ছাড়। হ্ হ্ যাও যাও। হেরে শংকরী তোর মুখের দাগ গুলা বেশ বেড়েছে।তুই তো বুড়ি হয়ে যাচ্ছিস! এমনি করে তুমার বলার কি আছে ! না না এমনিই বলছি রে। যাও যাও ভুটে যাও।আমি পরে যাইঠি।দুরের সব লুকেরা ভুট নিতে আসবে একটু আলতা সিঁন্দুর আর মাথায় তেল দিয়ে যাবো।দেখবে তখন কেমেন লাগে। হ্ হ্ আয়!
ভুটের লাইনে দাঁড়িয়ে শংকরী তার টুঙ্কুকে দেখতে পেল না!

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো।লম্ফের আলোয় দুটো বাচ্চা কি পড়ছে! শংকরীর মাথায় ঢুকে না।সে অপেক্ষার সময় গুনছে;কখন বাড়ি ফিরবে ছোট কচির বাপ! রাত গভীর হলো।বাচ্চা দুটা ঘুমিয়ে পড়েছে।শংকরী পান্তার থালা সাজিয়ে ঠুলছে…ভোরের দিকে সময় এগিয়ে চলেছে!

তিনদিন পেরিয়ে গেল! টুঙ্কু বাড়ি ফিরে লাই।ভোটে অজিত বাবু জিতেছে।শংকরী এসে বলল: আমার টুঙ্কু কাই? সে তো বাড়ি আসে লাই।এসে যাবে। তুই ভাবছিস কেন? এখন যা কাল মিছিল আছে,তার কর্মসূচী আছে।তাহলে কি কাল ফিরবে? হ্ হ্ কাল আসবে তুই যা এখন।

সকাল হতে না হতেই সব ঢেবরা ঢেবরা বকসো এসে গেছে।জেনারেটাও এসেছে।শংকরীও ঘর দরে লাতা দিয়ে বিজয় মিছিলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত…

পাড়ার মেয়ারা সব কি লাচ লাচছে।শংকরীর মনে বেশ আনন্দ।ভুটে কাজ সেরে তার স্বামী আজ ফিবে।এই শংকরী দাঁড়িয়ে আছিস কেন? লাচ। আমরা তো লেচেই চলেছি।তুই আয়।সেও পা মিলালো।মিছিল এগিয়ে চলেছে ইসকুল পাড়ার দিকে।ঘামের সাথে সিঁন্দুর নাক পর্যন্ত এসে গেছে।লাচের তোড়ে ভুলেছে সব।কারণ টুঙ্কু বাড়িয়ে আসছে।

মিছিল শেষ।কলাপাতায় গরম ভাত আর মুগা মাংসের ঝোল।নাকের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।সবাই পোতে খাচ্ছে।এখানে নতুন লুকেদের দলে তার স্বামীকে দেখতে পাচ্ছে না! একসাথে দুটো খেয়ে ঘরে যাবে।

সব বকসো খুলা হয়ে গেল।পার্টী আপিসে চাবি পড়ছে।ও কাকু! টুঙ্কু তো এলো না! টুঙ্কু! তুই অজিত বাবুর সাথে দেখা কর।সে কাই! উন্নয়ন কমিটির মিটিং বেরিয়ে গেছেন।বিকালে আসবেন।
বড় কদম গাছের তলায় অপেক্ষায় বসে রইল সে।সন্ধ্যা হল,রাত হল,কিন্তু অজিত বাবু মিটিং করে ফিরল না।শংকরী কিছু বুঝতে পারছে না! সারাদিন এক থাকা বাচ্চাগুলা কি করছে সে জানে না!

মায়ের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তারা ঘুমিয়ে পড়েছে।ছাগলটা তাকে দেখতে পেয়ে পেঁ পেঁ করে ডাক দিল।মাথায় হাত দিয়ে মুখের সামনে এক আঁটি ঘাস দিয়ে ঘরে ঢুকে শংকরী।ঘুমন্ত বাচ্চাদের পাশে বসে পড়লো।মানুষটার জন্য মনটা হাউ হাউ করে উঠছে।কোথায় আছে! কানে ভেসে আসছে অজিত বাবুর গাড়ির শব্দ…..
                          ………….. 


            আমার ভাষা মায়ের ভাষা

: দাঁড়িয়ে তুমি কি দেখছো?
কোনো উত্তর পেলনা অন্তরা। স্কুলের দিকে পা বাড়ালো।
গতিময় রাস্তা আর ব্যস্ত মানুষ সময়কে ধরার জন্য দ্রুতগতিতে ছুটছে।আমিও ব্যতিক্রমী নয়।

অন্তরা স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে আর নিজের মনকে আবদ্ধ করে ফেলেছিল।সে ভুলেই গিয়েছিল; না উত্তর দেওয়া অজানা মানুষটির কথা।স্কুলেই শেষ ঘণ্টা মনে করিয়ে দেয় ঘরে ফেরার কথা।মনে করিয়ে দেয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কথা।

চটজলদি এগিয়ে গেল।দেখল একই ভাবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে।
: এই যে তুমি কি দেখছো?  
অনেকবার অনেক রকম ভাবে বলল! তারপর অচেনা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি উত্তর দিল;আমি ভাষা!প্রথম মা যে কথা শিখায় সেই ভাষা!তুমি আমার শরীরে দেখতে পাচ্ছো রক্তের দাগ! তুমি অনুভব করেছো কোনো দিন; মায়ের মুখের শব্দগুলি কেমন করে বিদেশী শব্দ গ্রাস করে নিয়েছে!তুমি কখন দেখেছো, তোমার সন্তান তোমার ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাতার পাতা ভরাছে! তুমি কিন্তু একটি বারও বলনি আমার ভাষা আগামীদিনে তোর পথ চলার কথা বলবে।তুমি ধার করা কথা শেখাচ্ছো আর স্বপ্ন দেখাচ্ছো! তুমি আমাকে মারতে চাইছো! আমি ভাষা,আমি মায়ের ভাষা…

অন্তরার মনে পড়ছে,বাড়ির গ্রেটে দাঁড়িয়ে তার ছেলে বলছিল; মা তুমি কখন ফিরে আসবে…
                        …………………..


                    পড়ন্ত বিকেল

বিকেলের বকুল ফুল ঝরে পড়ছে।তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আলোর বাড়ির দালান।জীবনের উপর দিয়ে
ঘটে যাওয়া ঝড় মনের ছোট ঘরকে ভেঙে চৌচির করে দিয়েছে।

এখন দিব্যবান এক মাসের। ঠিক তিন মাস আগে  ঘটে গেল আলোর জীবনে আকাল বোধন।তার সন্তানের পিতার আকাল মৃত্যু। আসলে মৃত্যু কারো কথা রাখে না!

স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া জীবনে সন্তানকে নিয়ে রাত জাগে।জীবনের ওঠাপড়ার দিনগুলোর কথা ভেসে আসে চোখে।আগামীর রূপরেখা কেমন হবে তা জানে না আলো!সে তাও জানে না তার জীবনের আলো কি ভাবে জ্বলবে!

দাদার মৃত্যু মন ভেঙেছে ঋষির। এখন তার উপর অনেক দায়িত্ব।সদ্য পিতা হারানো নবজাতকের দায়িত্ব, স্বামী হারানো মানুষটিকে লক্ষ্য রাখা আর বয়স্ক মায়ের সেবা। ঋষি ক্রমে বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে।বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও তা বিফল হচ্ছে।আসলে সেই কবে থেকে আলোকে নিজের বান্ধবী হিসাবে দেখে আসছে। আর একসময় নিজের দাদার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তার প্রিয় বান্ধবী। একটি সংসার আর হাজার সুখ।কিন্তু এখন সব অধুরা।

দিব্যবান সপ্তাহ মাস শেষ করে এক বছরে পা দিয়েছে।ঋষি নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে সংসারের হাল ধরেছে। আলো ক্রমে ঋষির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে দিব্যবান তার ছোট গলায় পাপা বলে ডাকে ঋষিকে।কেউ বাধা দেয় না।ঋষিও সন্তান স্নেহ সব মেনে নেয়।
একটা সময় দুই পরিবার নিজেেদের পরিবারের কথা ভেবে এবং আরো পড়ে থাকা আলোর জীবনের কথা ভেবে,দিব্যবানের মুখের দিকে তাকিয়ে উভয়ের কাছে বিবাহের সিদ্ধান্তের কথা জানালেন।

কয়েকদিন কেটে গেছে।দুই পরিবার কিছু বলছে না! তাঁরা অপেক্ষা করছেন উত্তরের।

: আলো আমি তোমাকে নিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধব।তোমার কি মত?
:দিব্যবান পৃথিবীর আলো দেখার আগে থেকে তোমার দায়িত্ববোধ আমাকে সমস্ত কিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। তুমি আমাকে আপন করে নাও তোমার মতো করে। অকপটে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল আলো।

এখন দিব্যবান ছয়।আলো ভুলে গেছে স্মৃতি।ঋষি
আগামীর কথা ভাবে।
——————

★★★

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *