ই ন্দ্র নী ল   ব ক্সী-র ধারাবাহিক উপন্যাস–“চোরাবালি”(পর্ব-৮)

পরিচিতিঃ ইন্দ্রনীল বক্সী, “জন্ম – নকশাল পিরিয়ডে ..৭৩ এ দুর্গাপুরে , উচ্চতা মাঝারি, গায়ের রঙ মাজা, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল টাইপ। লিখছি সেই কিশোরবেলা থেকে, দুর্গাপুর বেলা থেকে বর্তমান নিবাস – বর্ধমান। কি লিখছি ছাই নিজে তো জানিই না অন্যরাও জানে বলে মনে হয় না। হাবিজাবি করে চারটি বই প্রকাশিত।” বাইফোকালিজম্-এ তাঁর আজ ধারাবাহিক উপন্যাস ‘চোরাবালি‘-র অষ্টম পর্ব

ই ন্দ্র নী ল   ব ক্সী-র ধারাবাহিক উপন্যাস

চোরাবালি(পর্ব-৮)

কাঠগোলা ঘাটের বাতাস আজ একটু ভারী ঠেকছে গদাই ঘোষের। মেজাজও বিগড়ে রয়েছে। ঘাট অফিসের চেয়ারে বসে বুধুয়ার দিয়ে যাওয়া লিকার চা প্লেটে ঢালতে ঢালতে এক চিলতে জানালা দিয়ে বাইরে দামোদরের চরের দিকে তাকিয়ে থাকে গদাই ঘোষ, বহুদিন তেমন কোনো হুজ্জুতি পোয়াতে হয়নি, এ লাইনে হুজ্জুতি নিয়মিত ব্যাপার। কিন্তু গদাই ঘোষ নিজের বুদ্ধিতে আর সরকারি দফতর আর পুলিশের সঙ্গে রফা করে বাদ বাকি খাদান মালিকদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া গড়ে তুলেছিল, কিন্তু… এই ব্যাটা সুরিন্দর বেশ ঝামেলা পাকাচ্ছে। সঙ্গে ওপাড়ের ঝুঝুটির ঘাটের কটা উঠতি ছেলেও রয়েছে। ওদের হাত করেছে সুরিন্দর বেশ বুঝতে পারছে, নইলে এ এলাকায় গদাই ঘোষের নৌকা ভাগিয়ে দেওয়ার হিম্মত করা সহজ নয়। লোডিংয়েও ঝামেলা করেছে কানে এলো। ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে গদাই ঘোষের… ঘটনা এরকম, একটা বোট ছাকনি বালি ছানতে ছানতে ঝুঝুটির দিকে চলে গেছিল, নৌকায় ছিল নিয়ামতের ভাইপো আসলাম আর মাঝি। ঝুঝুটির ঘাটের থেকে বেশ দূরেই ওরা ছিল, এরকম সময় ঘাট থেকে গোটা চারেক ছেলে এসে চমকে তাড়িয়ে দেয় ওদের। ছেলেগুলোর সঙ্গে তর্ক করায় আসলামকে দু চার ঘা গায়েও হাত তোলে, মেশিন দেখায় ! মেশিন!…গদাই ঘোষের লোককে মেশিন দেখাবে শালা এতো হিম্মত! মেশিন দেখানো কাকে বলে বুঝিয়ে দিত আজ থেকে বিশ বছর আগের গদাই ঘোষ হলে! এখন নেহাত বয়স হয়েছে… তাছাড়া এসব ছিঁচকে ঝামেলায় নিজে জড়িয়ে পড়াটাও উচিত হবে না। গদাই ঘোষ এখন শহরের গন্যমান্যদের গুনতিতে পড়ে, লায়ন্সের মেম্বার, তার সামাজিক প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্যাপারটা ঠিক হবে না। কিন্তু একটা ব্যবস্থা তো নিতেই হবে! দেখা যাক, ওসি তাপস খাঁয়ের সঙ্গে একবার শলা করতে হবে, প্রতি মাসে মাসোহারা, আরও কত শখ আহ্লাদ মিটিয়ে তাকে পুষছে গদাই ঘোষ! শালার আবার মাগীর নেশা চরম! কবে কাজে আসবে এসব!
বাঁধের ঢাল বেয়ে একটা লোক নেমে আসছে দেখতে পেল গদাই ঘোষ। একটু কাছে আসতেই চিনতে পারল, মনিরুল! ব্যাটা বেশ ক’দিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল, বাদুলিয়ায় দুজনকে ওর ট্রাকে চিটিয়ে দেওয়ার পর সেই যে হাওয়া হলো আজ ওর দেখা পেল গদাই ঘোষ। কেস অবশ্য সাল্টে গেছে থানায়, পার্টিও ঝামেলা পাকাবে না আর। খবর পেয়েছে গদাই ঘোষ আগেই, যে মনিরুলের গাড়ি আবার ভিড়ছে ঘাটে।
-“ কি হে… বেশ খোস মেজাজ মনে হচ্ছে… তা তোমার সেই গুণধর ড্রাইভার খোকন না কি যেন নাম… সে কোথায়?”
মনিরুল হাসে, মাথা নাড়ে মুখে জবাব দেয় না।
-“তা এদিকে তো বাচ্চা ছেলেগুলো সব শের হয়ে যাচ্ছে!… এত হিম্মত গদাই ঘোষের সঙ্গে পাঙ্গা নিচ্ছে!”
-“হ্যাঁ শুনলাম, সুরিন্দর পাকিয়েছে কেসটা… দাঁড়ান, একটু বাড়তে দিন ঘোষদা… তারপর শালাদের দেখছি।” এবারে অফিসের প্লাস্টিকের টুলটা টেনে বসতে বসতে বলে ওঠে মনিরুল।
-“উঁহু…বেশি বাড়তে দিলে হবে না… ফণা ছোটো থাকতেই ব্যবস্থা নিতে হবে…ভাবছি সুরিন্দার এত সাহস পেল কি করে! কে সাপোর্টে আছে?”
-“কে আবার… নিতাই… ওই শালাই সেদিন লোডিংয়ে বাওয়াল করেছিল। নতুন নেতা হয়েছে না! জেলা যুব কি একটা …চিন্তা করবেন না… দাদা আপনার নুন খেয়েছি, শালাদের ঠিক টাইমে প্যাক করব।”
-“খোকন কই! …গাড়ি থেকে সেই যে নামালে দুটোকে চেটানোর পর… আর পাত্তা নেই…!”
-“আসছে… ওকে ট্রলিতে রেখেছি… কদিন যাক আরও…”
-“হুম… এই ঘাটটা বেওয়ারিশ পড়ে থাকছে… এখানে একটা ভালো লোক রাখতে হবে যা দেখছি, এই শালা বুধুয়াটাকে দিয়ে হবে না…”
-“আমিও তাই ভাবছিলাম দাদা… বেশ একটা চালাক চতুর, কিন্তু হিম্মৎওয়ালা লোক দরকার, নিয়ামত, আসলাম, বিনোদরা তো রইল… বিহারী পট্টির দুটো চ্যাংড়াকেও বলে রেখেছি, কিন্তু …”
-“ হ্যাঁ… লোক বাড়াতে হবে এখানে, সুরিন্দারের হাত লম্বা হচ্ছে…” জানালা দিয়ে বাইরে দামোদরের দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে কথাগুলো বলে গদাই ঘোষ। কিন্তু ঘাট সামলানোর ভালো বিশ্বস্ত লোক বললেই তো পাওয়া যাবে না। এ কাজ সবার দ্বারা হবেও না…।
ফ্লাক্সের চা মনিরুলকে কিছুটা ঢেলে দিয়ে আর একবার নিজের জন্য নেয় গদাই ঘোষ। মনিরুল গদাই ঘোষের অনেক পুরোনো সঙ্গী, খুব বিশ্বস্ত। ভ্যানে চাল পৌঁছাত গদিতে, গদাই ঘোষই ওকে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ট্রাক কেনার জন্য একসময় টাকা দেয়, আজ তিনটে ট্রাকের মালিক, কিন্তু গদাই ঘোষের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্কটা রয়ে গেছে আজ বহু বছর। কিছু মানুষ রয়ে যায় সঙ্গী চিরকাল, এই ধান্দা সর্বস্য দুনিয়ায়, লেনদেনের হিসেবের বাইরেও কিছু হিসেব থাকে যার জমা খরচের হিসেব বলে কিছু থাকে না । মনিরুল সেরকম একজন, যেমন ড্রাইভার রমেশ, মিলের সনাতন।
বাঁধের ঢাল বেয়ে একটা ট্রাকটর পিছনে ট্রলি নিয়ে সোজা নেমে গেল ঘাটের বাঁ দিকে, যেখানে লোডিং করা হয়। ট্রাকটরটা চালাচ্ছে খোকন, পিছনে ফাঁকা ট্রলিতে তিনটে লেবার। ট্রলিটা লোডিংয়ে লাগিয়ে লাফ দিয়ে নেমে আসে খোকন। মাস্টারের আস্তানায় সেদিনের মস্তির পর একবার ইন্দাসে ঘরে গেছিল পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে, আজ সকাল সকালই ফিরেছে। মুখের বিড়িটায় দুটো লম্বা টান দিয়ে ফেলে দেয় খোকন, ঘাট অফিসে এই সময় ঘোষবাবু থাকবেই…
লম্বা মানুষ, মাথা অল্প নিচু করে অফিসের ঘরে ঢোকে খোকন। মনিরুল, গদাই ঘোষ দুজনেই তাকিয়ে ছিল ওর আসার দিকে।
-“কি হে খোকন বাবু!… খবর কি? দেশে পরিবার সব ভালো তো?… বেশ কদিন ছুটি কাটিয়ে এলে কি বলো?” গদাই ঘোষ একটু রঙ্গ করেই খোকন কে বলে ওঠে।
খোকন নিঃশব্দে মাথা নাড়ে, একটু লজ্জা লাগে। এত বছর স্টেয়ারিং ধরেছে, তেমন বড় গোলমাল করেনি বলা যায়… এর আগে একবার বাইপাশে একটা গরুকে উড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এবারে …দোষ যদিও ওর ছিলো না, কিন্তু সবসময় বড় গাড়ির দোষ ধরাই অ্যাক্সিডেন্টের নিয়ম!
“চিন্তা নেই, ওদিকে সব সাল্টে গেছে, বাবুই সব সামলেছে… এবার লেগে পড়। আর যদি শুনেছি মাল খেয়ে গাড়িতে উঠেছিস… সত্যি করে নামিয়ে দেব গাড়ি থেকে মনে থাকে যেন!” মনিরুল খোকনকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে।
খোকন কোন উত্তর না দিয়ে অল্প হেসে বাইরে দূরে দাঁড়ানো ট্রাকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকদিন হলো এই ঘাটে আসছে, মনিরুল মালিক খারাপ নয়, তবে রেগে গেলে বেজায় মুখ খারাপ করে। এই ঘাটের লোকজনও ওর বেশ আপনার হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই আঁজির বাগানে বুধুয়াদের আড্ডায় যায় খোকন ওদের গান বাজনার আসর বসে প্রায় দিনই, দেহাতিতে শিয়া-রামকে গানের আসর, কখনও বা হনুমান চালিশা… বেশ কেটে যায় সময়টা।
“একটা বেশ ভরসার লোক দেখ দেখি মনিরুল!… এভাবে এ ঘাটটা সামলানো যাবে না… বুঝলে…” গদাই ঘোষের মনিরুলের উদ্দেশ্যে বলা কথাগুলো খোকনের কানেও এসে পৌঁছয়। তাহলে কি বুধুয়ার চাকরি গেল!… নাঃ গদাই ঘোষের বহু পুরানো চ্যালা বুধুয়া। একদম নিজের হাতের মতোই বিশ্বাসী! ওকে ঘোষবাবু ফেলবে বলে মনে হয় না। তবে বুধুয়া ব্যাটাও একটু ভোঁদাই গোছের, ঘোষ বাবুর এক ইশারায় কারো গর্দান নামিয়ে দিতে পারে মুহূর্তে, কিন্তু নিজের বোধবুদ্ধি দিয়ে কাজ করার প্রবণতা বড়ই কম! হুকুম তামিলে একফোঁটা ফাঁক রাখে না কিন্তু ওই… যা বলা হবে, যতটা বলা হবে ততটুকুই ব্যাস! দিনভোর খিদমত খাটার জন্য ঘোষবাবুর সামনে হাজির। এ’রকম লোক খুব দরকারের, কিন্তু ব্যবসা চালাতে গেলে একটু বোধবুদ্ধি যুক্ত লোক দরকার বৈকি! …খোকন ভাবতে থাকে মনে মনে, আচমকা কি মনে হতে ঘরের ভিতরে বসে থাকা দুজনের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বলে ওঠে…
“এক জন আছে বাবু… আমার পরিচিত… ভালো ছেলে, খিদেও রয়েছে মনে হয়।”
“কে? তোর সেই ভাইপো টা যেটা মেয়ে নিয়ে ভেগেছিল!” মনিরুল সোজা হয়ে বসে বলে ওঠে।
“না”
“তবে!… কোথাকার… শহরের?”
“কাছাকাছির… বাদুলের…”
“অ… তা নিয়ে আয় একদিন… কি ঘোষদা, কি বলেন?” এতক্ষণ চুপ করে শুনতে থাকা গদাই ঘোষের উদ্দেশ্যে বলে মনিরুল।
“হুম… বয়স কত ছেলেটার?” গদাই ঘোষ বলে ওঠে।
“কত আর ২০-২২ হবে! কলেজে পড়ে” খোকন আন্দাজে একটা জবাব দেয়।
“এঃ একেবারে বাচ্চা ছেলে…পারবে না”
“বাবু ওই বয়সের ছেলেই ভালো…গড়ে পিঠে নিতে পারবেন… একটু আনাড়ি হবে, কিন্তু বেশি সেয়ানা হলেও তো মুশকিল…তাই না?”
কথাটা মন্দ বলেনি খোকন! এই বয়সের ছেলেপিলে কে তাও গড়ে নেওয়া যাবে… বেশি সেয়ানা হয়ে গেলে চালবাজি করবে বেশি। গদাই ঘোষ অল্প ভেবে নিয়ে ঠিক করে ফেলে, দেখাই যাক না! এখানে তো আর বিজ্ঞাপন দিয়ে চাকরির পরীক্ষা হয় না, পরীক্ষা হয় ফিল্ডে… তাও আবার কলেজ পড়ুয়া! দেখাই যাক…
“তাহলে একদিন নিয়ে এসো… কাজের কথা আগাম কিছু বলবে না… কি কাজ, কার কাজ , কোথায় কাজ… কিছুই না। মনে থাকবে?”
খোকন মাথা নাড়ে। প্রকাশ না করলেও মনে মনে বেশ খুশি হয়। ছেলেটাকে প্রথম দিন দেখেই কেমন মায়া পড়ে গেছে ওর, কিছু করতে পারলে ভালই লাগবে। কিন্তু এখন চাঁদু এই কাজ করতে রাজি হলে হয়! ভাবতে ভাবতে অফিস থেকে বেরিয়ে কিছুটা এসে একটা বিড়ি ধরায় খোকন। দূরে চরায় নৌকা উল্টিয়ে খোলে কি সব মেরামতে ব্যস্ত নিয়ামত, এগিয়ে যায় সেদিকে। রোদ বেশ চড়ে গেছে এখন, দামোদরের মাঝ বরাবর ক্ষীণ জলধারা চিকচিক করছে। উল্টানো নৌকায় নিয়ামত আলকাতরা লেপছে, রোদ পড়ে চকচক করছে নৌকার খোল। লুঙ্গি পরা খালি গায়ে নিয়ামতের দড়ি পাকিয়ে যাওয়া কালো মেদহীন শরীরের প্রতিটা পেশীতে রোদ ঠিকরে নামছে, পেশীর প্রতি খাঁজে অসম্ভব পরিশ্রমের সাক্ষর ফুটে উঠেছে। এই নদী, বলা ভালো নদীর চর, বালিকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার লোকের অর্থনীতি বয়ে চলেছে। সেই পাল্লা থেকে শিল্যাঘাট পর্যন্ত। না জানি আরও কত দূর! কত রকমের পেশা এই বালি কেন্দ্রিক লেনদেন কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, সরাসরি ব্যবসায় কাজ ছাড়াও রয়েছে চায়ের দোকান, চোলাইখানা, লেবারদের জন্য সস্তা ভাতের ঝুপড়ি হোটেল। দিব্যি বয়ে চলেছে কাঁচা পয়সার সমান্তরাল অর্থনীতির সুঠাম শৃঙ্খল। সবার বরাদ্দ নির্দিষ্ট, কাজ ও ক্ষমতা অনুযায়ী কেউ বেশী কেউ কম। কম যাদের কম হলেও রোজগার মন্দ নয়, অন্য অনেক কাজের তুলনায় বরং কিঞ্চিৎ বেশীই। শুধু নিঃশব্দে লুঠ হয়ে চলেছে দামোদর…
খোকন নিয়ামতের পিছনে এসে দাঁড়ায়। নিয়ামত মগ্ন হয়ে আলকাতরায় ভিজে একটা ন্যাকড়া বুলিয়ে চলেছে, হঠাৎ মানুষের ছায়া পড়তেই চমকে পিছন ফেরে।
“আরে! ওস্তাদ যে ! কতক্ষণ?” নিয়ামত হাত মুছতে মুছতে বলে ওঠে।
“এই কিছুক্ষণ…তা নৌকা রিপিয়ারিং হলো?”
“হ্যাঁ …ওই মাঝে মাঝে একটু না বাগালে চলে বল! …সারাদিন জলে পড়ে রয়েছে।” বলতে বলতে নৌকার গায়ে পরম মমতায় হাত বোলায় নিয়ামত। খোকন হাসে মনে মনে, তারও তো একই রকম মমতা রয়েছে এত বছরের ৭২৮২ র উপর। সকালে বেরোবার আগে ভালো করে মুছে, টায়ার ধুয়ে, ধুপ দিয়ে তবেই স্টেয়ারিং ধরে সে। ট্রাক হোক কিংবা নৌকা… এরা কেউই শুধু কাঠ, লোহার প্রাণহীন বস্তু নয় তাদের কাছে, বরং বড্ড আপনজন…
“তাহলে আজ ছুটি?… ছাকনি মারতে কে গেল?”
“আর একটা নৌকা দিয়ে ভাইপোটাকে পাঠিয়েছি… দেখা যাক কি করে!”
“সেদিন শুনলাম কিসব বাওয়াল হয়েছে!”
“হ্যাঁ… ওই শালা সুরিন্দারের চামচাগুলো বাচ্চা ছেলে পেয়ে আমার ভাইপোকে চমকেছে… এত্ত চর্বি হয়েছে মাদারচোদদের…” বলতে বলতে নিয়ামতের চোখ যেন জ্বলে ওঠে।
“হুম… শুনলাম, বহুত বেড়েছে শালারা… সাপোর্ট পাচ্ছে যে!”
“ওসব বুঝিনা… ভেজা যেদিন ফিরবে নামিয়ে দেবো সুযোগ পেলে, নিয়ামতকে চেনে না… মেরে নদীর গাবায় পুঁতে দেবো… কোনো শালা হদিশ পাবে না” নিয়ামত কেটে কেটে উত্তর দেয় ।
“হাল্কা ওস্তাদ… মাথা গরম কোরো না, বাবুও দেখছে ব্যাপারটা।” খোকন জানে নিয়ামত ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছে না, অনেকদিন চেনে সে নিয়ামতকে। এই লাইনে মাঝে মধ্যে দু একজন বেমালুম হাপিস হয়ে যায়, তাদের কোনো খোঁজই পাওয়া যায় না। কিছুদিন পর আর কেউ খোঁজও করে না। নিয়ামত এখন মাঝ বয়সে, বছর দশেক আগেও মাসকেট ওর নিত্য সঙ্গী ছিলো। ক্ষুর চালাতে ওর মতো ওস্তাদ খুব কমই ছিলো এই বাঁধ এলাকায়। এখন একটু বয়স হয়েছে, দুটো পয়সার মুখ দেখেছে সে, ঝুট ঝামেলা এড়িয়েই চলে। তবে সেরকম পরিস্থিতিতে আগুন আবার উসকে উঠতেই পারে একথা বাজি রেখে বলা যায়।
হাত মুছে একটা বিড়ি ধরায় নিয়ামত, খোকনের দিকেও একটা বাড়িয়ে ধরে। দুজনে উল্টানো নৌকার খোলের একচিলতে ছায়ায় এসে বসে, আয়েস করে বিড়িতে টান দেয়। ইতিউতি লোকজন যাওয়া আসা করছে। ওপাড় থেকে কেউ কেউ নদী পেরিয়ে আসছে বালি তোলার জন্য শালের লগ, পাটা দিয়ে তৈরী সাঁকো পেরিয়ে সাইকেল নিয়ে হেঁটে। বালিচরের উপর দিয়ে সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে বাঁধের উপর উঠবে গিয়ে, তারপর চলে যাবে শহরের দিকে যে যার দরকারে, আবার সন্ধ্যার মুখে ফিরবে এই একই পথে।
“তা ঘরের খবর কি ভাই… ভাবী, ছেলে-মেয়েরা সব কেমন আছে?” খোকন জিজ্ঞেস করে নিয়ামতকে।
নিয়ামত কেমন একটা বিষাদের হাসি মুখে ছড়িয়ে বিড়িটা বালিতে গুঁজতে গুঁজতে মাথা নাড়ে…
“বুঝলে খোকন ভাই যখন ভালোদিন এলো, পাকা আস্তানা হলো খোদা অন্য দিকে মেরে রাখল…” দামোদরের ক্ষীণ জলধারার দিকে অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে ধীরে উত্তর দেয় নিয়ামত ।
“কেন… কি আবার হলো? বেশ তো জমি বাড়ি করেছো শুনলাম… ছেলেও দাঁড়িয়ে গেছে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছো… আবার কি?”
“সে সব তো হয়েছে, এদিকে তোমার ভাবী মানে ফতেমাকে আর রাখতে পারবো কিনা জানিনা… ”খুব ক্ষীণ স্বরে একই ভাবে দূরে জলের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয় নিয়ামত।
“কেন! ভাবীর আবার কি হলো?” খোকন সোজা হয়ে বসে।
নিয়ামত এবার মুখ ফেরায় খোকনের দিকে,“ ফতেমার কালরোগ হয়েছে গো খোকন ভাই… ক্যান্সার…” নিয়ামতের চোখে চরের বালিতে পড়া রোদ যেন ঠিকরে চিকচিক করে ওঠে, মুখের রেখাগুলোয় অব্যক্ত বেদনার আঁকিবুকি।
“সেকি!… কোথায়?”
“বাচ্চার ঘরে… চেপে চেপে ছিল, বলেনি কোনদিনও… যা করে আমার তোমার ঘরের মেয়েছেলেরা!”
“কোথায় দেখালে?… মানে বুঝলে কি করে?”
“এখানেই, বদ্দমানে… এক মেয়েছেলের ডাক্তারকে… সেই কি সব টেস ফেস করালে…তারপর ধরা পড়ল”
“ও… সে, চিন্তা কোরো না আজকাল ক্যান্সারেরও ভালো চিকিৎসা হচ্ছে… ঠিক হয়ে যাবে…” মুখে সান্ত্বনা দিলেও একটু গুম মেরে যায় খোকন।
“না হে… তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে এককথা… ছেলে বলছে দক্ষিণে নে যাবে… যা খরচ হয় হবে… বউটা ক’দিন হল সুখের মুখ দেখেছিল… আমি আর ভেবে উঠতে পারছি না কি করব”
দুজনে এবার বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। পাটের সূর্য এখন মাথার উপর থেকে সামান্য পশ্চিমে ঢলেছে। বেলা বেশ বেড়েছে। খোকনের এবার পেটে টান ধরছে। মানুষের কোথায় যে শান্তি কে জানে! অভাব থাকলে এক জ্বালা, ঘুচলেও কিছু না কিছু যেন অপেক্ষা করছে পেড়ে ফেলবার জন্য… এবার উঠতে হবে ভাবতে ভাবতে দাঁড়িয়ে পড়ে খোকন, প্যান্টের লেগে থাকা বালি ঝাড়তে ঝাড়তে আর একবার নিয়ামতকে চিন্তা না করার, আর দরকারে তাকে যেন স্মরণ করে বলেই বাঁধের দিকে হাঁটতে থাকে। নিয়ামত ঠাঁয় বসে থাকে নদীর দিকে তাকিয়ে…

আজ ওর বাঁধা হোটেলে যাওয়া হবে না। এখানেই কোথাও পেট ভরাতে হবে, বাঁধ পেরিয়ে উল্টো দিকে একটা ঝুপড়ি ভাতের হোটেল আছে, ওখানেই আজ সেরে নেবে ঠিক করে নিয়ে হাঁটতে থাকে খোকন।
গদাই ঘোষের গাড়িটা নেই এখন বিহারী পাড়ার মুখে, থাকার কথাও নয়। ঘাট অফিসে বুধুয়া চেয়ারে পা তুলে এখন ঝিমোচ্ছে। ট্রাক মালিক মনিরুলও চলে গেছে এতক্ষণে। বিহারী পাড়ার পৌরসভার একটাই জলের কল, সেখানে লাইন পড়েছে বালতি হাতে, একটা বছর দশ-বারোর ছেলে কলের জলে স্নান করছে তো করছেই… দেহাতি ভাষায় ঝগড়া করছে দুই বিহারী মহিলা। বেলা বাড়ায় বাঁধের ওপরটা এখন কিছুটা নিঝুম হয়ে এসছে। আবার বিকেলের দিকে একচোট লোকজন আনাগোনা শুরু হবে। খোকন এইসব পরিচিত দৃশ্যপটের পাশ দিয়ে নির্লিপ্ত হেঁটে ঢুকে পড়ে ঝুপড়ি-হোটেলে।

লেখা পাঠাতে পারেন
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *