শিবুকান্তি দাশ এর ছড়াগুচ্ছ

পরিচিতিঃ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ শিবুকান্তি দাশ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানাধীন সুচক্রদন্ডী গ্রামের খাস্তগীর পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা স্বর্গীয় ননীগোপাল দাশ ও মাতা-অমিয়বালা দাশ।
স্কুলে পড়া থেকে শিশুসাহিত্য চর্চা করে আসছেন। ছড়া, কিশোর কবিতা,ছোট গল্প, উপন্যাস,প্রবন্ধ লিখে সারাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেন। বিশেষ করে কিশোর কবিতা চর্চায় তিনি পরিচয় রাখেন পাঠক মহলে। তার কিশোর কবিতা গুলোতে মুক্তিযুদ্ধ,ভাষা আন্দোলন, প্রকৃতি,সমসাময়িক ঘটনাসহ ইত্যাদি অনুষঙ্গ দেখা যায়।
এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৫। উল্লেখ্যযোগ্য বই গুলো হচ্ছে,কিশোর কবিতাগ্রন্থ ‘চলবো আমি আমার মতো’,‘রোদের কণা রুপোর সিকি,মাঠ পেরুলেই বাড়ি,আমি নাকি দুষ্টু ভীষণ। গল্প গ্রন্থ,জলপাই রঙের গাড়ি, ব্যাঙ ছানার সর্দি,পরির পাহাড় রহস্য,রানিপুকুরের দুষ্টু ভূত,মহাশূন্যের গল্প শোনো। কিশোর উপন্যাসগ্রন্থ, ‘যুদ্ধদিনের গল্প,আমাদের গুডবয়, রঙিন মেঘের ভেলা, ছড়াগ্রন্থ ‘লাল নীল ঘুড়ি ও ‘একটি ছড়া আঁকব বলে’। প্রবন্ধের বই ‘গল্পে গল্পে বাংলাদেশ, ছোটদের আবৃত্তির ছড়া-কবিতার সংকলন ‘ ‘আমাদের ছুটি আজ’, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ছড়া-কবিতাগ্রন্থ ‘বুকের ভেতর বঙ্গবন্ধু’ ও ‘আমার বঙ্গবন্ধু আমার স্বাধীনতা’ তিনি সম্পাদনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রমান্যগ্রন্থ‘ যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ ,আলোকের এই ঝর্নাধারা ও গল্প সংকলন ‘রাজকুমারি পরি ও ভূতের গল্প’ । তার সম্পাদিত অনিয়মিত ছোট কাগজ ‘এলোমেলো’ও ‘চিরকুট’।লেখালেখির জন্য ‘অগ্রণী ব্যাংক- শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার(২০১৭)এম নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার ( ২০০৭) ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশু সাহিত্য পুরস্কার (২০১৩) লাভ করেন।পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিক। কাজের ফাঁকে নানা সাংগঠনিক কাজের সাথেও নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য, বাংলা একাডেমীর সদস্য। পটিয়া আইন কলেজের প্রধান উদ্দ্যেত্তা প্রতিষ্ঠাতা, পটিয়া আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক, পটিয়াস্থ সৃজনশীল সাহিত্য গোষ্ঠী মালঞ্চ’র অন্যতম সংগঠক, চট্টগ্রাম একাডেমী ও চট্টগ্রাম সমিতি ঢাকার আজীবন সদস্য। চিটাগাং জার্নালিস্টস ফোরাম ঢাকার প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদক।

শি বু কা ন্তি দা শ’ এর দশটি ছড়া

প্রকাশিত কিছু বইপত্র

ভাষার লড়াই

ফাগুন এলে মনে পড়ে,মনে পড়ে একুশ
ভাষার জন্য প্রাণ ঝরেছে কার বা ছিল দোষ ?
মায়ের ভাষা কেড়ে নেবে সহ্য কি আর হয়
প্রাণের বিনিময়ে হলেও করতে হবে জয়।

ভিন্ন দেশিরা চাইলে কি আর দেবো মায়ের কথা
আমার মাকে মা ডাকিবার রাখবো স্বাধীনতা
যেই করেছে পন বাঙালি বাধলো ভাষার লড়াই
সারাদেশে আওয়াজ ওঠে কাউকে নাহি ডরাই।

দিকে দিকে শক্ত হাতের মুঠি উঠে উর্দ্ধে
পাকিস্তানি কুকুর গুলো ঘেউ ঘেউ ঘেউ দৌড় দেয়
যাকে পেলো তাকে কামড় দেয় ছুটিয়ে রক্ত
একুশ তারিখ ঢাকার বুকে দুপুর বেলার অক্ত।

সালাম বরকত রফিক শফিক রক্তে রাঙায় দেশ
শোকের ভারে স্তদ্ধ হলো উত্তাল পরিবেশ
মানতে হলো বাংলা ভাষার ন্যার্য অধিকার
আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা আসুক বারে বার।

যতই ভাবো

তোমরা আমায় যতই খারাপ বলতে পারো
হতচ্ছারা গাধা বলদ কিংবা আরো
কিচ্ছুটিকে গায় মাখি না নিজেই চলি
আমার যত কথা আছে তাকেই বলি।
আমি কি আর সুধীর সবুজ তপুর মতো
ক্লাসের পড়া পড়েই যাবো অভিরত
গল্প ছড়া আর কবিতা প্রিয় আমার
বাবা যতই বখবে আমায় পড়ব বারবার।
দুষ্টুমীতে সেরা যারা কেউ দেখে কি
আমার দিকে নজর শুধু ছি ছি ছি।
পড়তে বসলে চোখ চলে যায় পথের দিকে
ঘরের ভেতর কতক্ষণ আর মনটা টিকে
আকাশ জুড়ে সন্ধ্যা তারা কী অপরুপ
উল্লাসে কেউ থাকতে পারে না হেসে চুপ।
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে সবার জানা
টের পেয়ে কেউ ফাঁদ বসালে কিসের মানা
তবু আমি পরীক্ষায় পাশ করলে সাড়া
সবার মাথায় বাজ পড়ে যায় পাগল পারা।

বৈখাশে

বৈশাখ মানে কড়কড়ে রোদ সবুজ গাছের পাতা
আম কাঠঁলের গন্ধে বিভোর কিশোর মনের খাতা
বৈশাখ এসে দেয় রাঙ্গিয়ে রঙিন ফুলের ডালা
এসো এসো বৈশাখ এসো গলায় পড়ি মালা।
বৈশাখ আনে ঘরে ঘরে নতুন দিনের গান
বটের ছায়া তরুলতায় যায় জুড়িয়ে প্রাণ
বৈশাখ মানে হালখাতার এক আনন্দ উৎসব
সবার প্রাণে দোল দিয়ে যায় প্রাণের কলরব।
বৈশাখ আসে গাঁয়ের মাঠে কত্তো মেলা খেলা
ঘোড় দৌড় আর পুতুল খেলায় যায় গড়িয়ে বেলা
বৈশাখ মানে প্রাণে বাজে বিশ্বকবির গান
রবীন্দ্রনাথ পথের দিশা স্বপ্ন অফুরান।

পথের দিশা রবীন্দ্রনাথ

বোশেখ মানে রোদ ঝিকমিক আকাশও গনগন
এমন সময় দুলে ওঠে আমার ব্যাকুল মন
রিনিকঝিনিক ছন্দ সুরে পাখিরা গায় গাছে
মনপবনের নাও ভাসালাম ররি’র সুরের কাছে।

মৃদঙ্গ খোল একতারা গায় মন্দিরে মন্দিরে
সুরের ধারায় গীতাঞ্জলি আমায় আছে ঘিরে
এক্কা দোক্কা খেলছে বিনু,উঠোন জুড়ে মেলা
রবীন্দ্রনাথ আমার প্রাণে ভাসিয়ে দেন ভেলা।

দুঃখতাপে বিশ্বকাঁপে ভাসে সোনারতরী
রবীন্দ্রনাথ পথের দিশা সঞ্চয়িতা পড়ি
যখন সেথায় থাকি আমার স্বপ্নে রবীন্দ্রনাথ
আমায় আশিস করো গুরু আনব রাঙ্গা প্রভাত।

নদীর কথা

যেই ছুটেছি নদীর কাছে রোদ্র নিলো পিছু
যাচ্ছি আমি আলাপ করতে বনিতা নয় কিছু
নদীর সাথে কত কথা আমার আছে জমা
ভাবছো বুঝি কেমন তরো নাও না ভেবে ওমা।

তুমিও যদি আমার মতো বুঝতে নদীর কথা
দুপুর রোদে ঝিকিমিকি স্তদ্ধ নিরবতা
সূর্যটা দেয় রোদের গুড়ো আগুন জ্বালে জলে
নদী তখন মনের ব্যাথা খুলে খুলে বলে।

বড় বড় জাহাজ গুলো কাটে জলের মাথা
নদীর কত কষ্ট তখন সারা গায়ে ব্যাথা
মাছ গুলো যে ছেলে মেয়ে তাদের ধরে জেলে
দুঃখ তখন গুমড়ে কাঁদে শরীরটা যায় মেলে।

চর পড়ে যায় নদীর মাঝে ভাগ হয়ে যায় নদী
এসব কথা তোমরা কভূ জানতে পারতে যদি
কেউ বা আবার নদীর ভেতর ইটের দেয়াল তুলে
শুনতে যদি বলতো নদী প্রাণটা যে তার খুলে।

ও জোনাকি

ও জোনাকি আলোর পাখি কোথায় তুমি থাকো
দিনের বেলা পাইনা তোমায় কোথায় আলো রাখো
তোমায় খুঁজি ফুলের বনে সান বাঁধানো ঘাটে
তুমি কি ভাই খেলতে ছোটো মিয়াবাড়ির মাঠে।
ও জোনাকি আলোর পাখি নদীর ধারে যাও কি
ফিন্নি পায়েস বিরিয়ানি আলুর দোলমা খাও কি
বিকেল হলে নীল আকাশে মেলো তোমার ডানা
তারার সাথে খেলতে কি কেউ তোমায় করে মানা।
ও জোনাকি আলোর পাখি গল্প তুমি জানো
দাদুর মতো গল্প বলা,ভাটিয়ালি গানও
তোমায় নিয়ে জোসনা রাতে করবো মজা কত
সঙ্গি নিয়ে আসবে তুমি নাচব অভিরত।
ও জোনাকি আলোর পাখি হবে আমার মিতে
দেবো তোমায় চুলের খোপা রঙিন চুড়ি ফিতে
রিকসা করে ঘুরব দুইজন হাতির ঝিলে গিয়ে
তবে তোমার মন জোগাব ভালোবাসা দিয়ে।

কটা দিন ঘরেই থাকি

খায় দায় ঘুম পাড়ি কিছু ভালো লাগে না
টিভি দেখি গান শুনি তবু মন জাগে না
জানলাটা খুলে দেখি আকাশে কালো মেঘ
মা বলে বৃষ্টি কি আসবে রে দ্যাখ দ্যাখ।
বৃষ্টিটা আসলে তো ঝিম ধরা পরিবেশ
গা ঝারা দিয়ে উঠে নিরবতার হতো শেষ
সতেজ সবল হতো চারদিকের আলো
সূয্যটা কাটে যেমন আঁধারের কালো।
দিন যায় মাস যায় ঘরে কাটে বেলা
‘করোনা’ শোনো ভাই, খেলছো কোন খেলা
তোমার অশুভ থাবা কাঁপে পুরো দেশ
তুমিও জেনে রাখো হবে নিশেষ।
তোমার কারনে আজ পৃথিবী অন্ধকার
বিজ্ঞানিরা দেবে তোমার প্রতিকার
আবার হাসবে দেশ ডাকবে ভোরের পাখি
আর ক টা দিন চলো ঘরেই থাকি।

কর্ণফুলির কাছে

ভর দুপুরে গেলাম সেদিন কর্ণফুলির কাছে
সূর্য্য তখন জলের উপর থির হয়ে যে আছে
ইলিশ মাছের পিঠের মতো জলের ধারা নাচে
মাঝে মাঝে ঝিলিক মারে রুই কাতলা মাছে।
দেখতে দেখতে ভাসছি আমি হাওয়ার তালে তালে
তাল গাছ এক দাঁড়িয়ে আছে কালের পরে কালে
মাঠের পরে ডানা মেলে বট বৃক্ষ ডাকে
তপ্ত রোদের ঘামে ভেজা শীতল হতে কাকে।
একটু খানি ছায়ায় বসে উড়ল বনের পাখি
নীল আকাশে ঘুরছে তখন আমার দুটো আঁখি
মাঠে মাঠে সবুজ খেতের কী যে মধুর গন্ধ
মটর শুটির লতায় পাতায় মুগ্ধ দুচোখ বন্ধ।
সাঁঝ বিকেলে কুটুম পাখি ডাকছে মিষ্টি সুরে
রাখাল ছেলে বাজায় বাঁশি ফিরছে বাড়ি দূরে
আমিও তখন বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম জোরে
কর্ণফুলির নায়ে বেড়ায় রাতের শেষে ভোরে।

ঈদের দিনে

আজকে ঈদের খুশির দিনেও কেউ হাসে না কেউ
সবার ভেতর অজানা ভয় অথই নদীর ঢেউ।
আসলো দেশে ভাইরাস এক করোনা তার নাম
মুত্যু লেখা তার হাতে বেশ কালো কালো খাম।
সর্দি কাশি জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্ট হলে
মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ে সব কিছু যায় জলে।
ভয়ে ভয়ে সবাই আছি নিজ নিজ ঘরে
এমন দিনে ঈদ যে এলো কে আনন্দ করে।
ঈদ মানে তো হাসি খুশি ঈদ মানে তো গান
ঈদের দিনের গল্প মানে স্বপ্ন অফুরান।
ঘরে ঘরে ফিন্নি পায়েস কোপ্তা পোলাও খাও
এই ঈদে কি খাবে তুমি খোদার কাছে চাও।
আজকে সবাই শপথ করি ঈদ করবো ঘরে
সামাজিক দূরত্ব মেনে বাঁধব প্রীতিডোরে।
করোনাকে তাড়িয়ে দিয়ে আসছে বছর সবে
ঈদ করবো মহানন্দে এই আশাটা রবে।

প্রার্থনা

হে ঈশ্বর শুনছো তুমি ? এ পৃথিবীর কান্না
মৃত্যু দানব গিলছে মানুষ, আর না, আর না।
থামিয়ে তুমি দাওনা কেন করোনা’কে মেরে
কত মায়ের আতœাজাকে নিচ্ছে কেবল কেড়ে।
আমরা না হয় তোমার নিয়ম মানিনি একদম
রাগ করে তাই পাঠিয়ে দিলে মহামারি যম !
আজকে আমরা শপথ নিচ্ছি তোমার পথে চলার
শত দুঃখ যন্ত্রনাতেও সত্যকথন বলার।
দুর্নীতি আর রাহাজানি করবো পরিহার
মায়ের নামে দিব্বি করছি একশ হাজারবার
পাহাড় কেটে নদী ভরাট আর করবো না কভূ
ফুল পাখি আর গাছ-পালাকে রাখবো দেখে প্রভু।
ধনী গরিব রাখবো না আর কোন ভেদাভেদ
ধর্মে বর্ণে থাকবে না আর হিংসা বা বিভেদ
আজকে সবাই চাইছি ক্ষমা তোমায় স্মরণ করি
হে দয়াময় করো দয়া নতুন জীবন গড়ি।

আমাদের এ দেশ

আমাদের দেশটাকে বড়ো ভালোবাসি
মা মা ডাকে শিশু মুখে মধুর হাসি
চারিদিকে গাছ পালা সবুজের মেলা
মাঠে মাঠে ছোটদের কত প্রিয় খেলা।
ভোরের আযান ধ্বনি লাগে সুমধুর
মিন্দরে শঙ্খ বাজে ভেসে আসে সুর
লোকজন জেগে উঠে কাজে দেয় মন
খোকা খুকি ইশকুলে পড়ে সারাক্ষণ।
আমাদের দেশটা ছিল না স্বাধীন
ছিল মুঘুল ইংরেজ,পাঠানের অধীন
যুগে যুগে বাঙালিরা লড়াই করে
ক্ষুদিরাম প্রীতিলতা তিতুমীর মরে
সবশেষে এলো বীর শেখ মুজিবুর
বাজিয়ে দিলেন তিনি স্বাধীনতার সুর।
সেই সুর ভেসে যায় দেশ থেকে দেশে
মুক্তির দিশা পায় বাঙালি হেসে
লাখে লাখে মরে বীর ভয় নাহি করে
লাল সবুজের পতাকাটা উড়ে ঘরে ঘরে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *